মানুষের প্রভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি হ্রাস: প্লিওসিন যুগের পর দ্রুততম পরিবর্তন
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখের (ETH Zurich) বিশেষজ্ঞদের পরিচালিত সাম্প্রতিক এক ভূ-পদার্থগত গবেষণায় পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিতে এক নজিরবিহীন ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে সরাসরি মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত প্রভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। 'Journal of Geophysical Research: Solid Earth'-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য প্রতি শতাব্দীতে গড়ে ১.৩৩ মিলিসেকেন্ড হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মন্থরতার গতি গত ৩.৬ মিলিয়ন বছরের মধ্যে দ্রুততম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মূলত পৃথিবীর ইতিহাসের লেট প্লিওসিন যুগের সমতুল্য একটি পরিবর্তন।
এই গ্রহীয় মন্থরতার প্রধান মেকানিজম বা প্রক্রিয়াটি হলো পৃথিবীর ভরের বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাস, যা মূলত মেরু অঞ্চলের বরফের স্তর এবং পাহাড়ি হিমবাহের দ্রুত গলনের ফলে ঘটছে। যখন পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের কাছাকাছি থাকা বিশাল বরফখণ্ডগুলো গলে যায়, তখন সেই পানি মুক্ত হয়ে মহাসাগরগুলোতে মিশে যায় এবং বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলে ঘনীভূত হয়। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা একজন ফিগার স্কেটারের ঘূর্ণন ধীর করার কৌশলের মতো; যখন একজন স্কেটার তার হাত প্রসারিত করেন, তখন তার জড়তার ভ্রামক বা মোমেন্ট অফ ইনার্শিয়া বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে তার ঘূর্ণন গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। ঠিক একইভাবে পৃথিবীর ভর বিষুবরেখার দিকে সরে যাওয়ায় আমাদের গ্রহের ঘূর্ণন গতিও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
এই জটিল ভূ-তাত্ত্বিক ঘটনাটি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার জন্য ইটিএইচ জুরিখের মহাকাশ ভূ-গণিত বিভাগের অধ্যাপক বেনেডিক্ট সোজা এবং ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোস্তফা কিয়ানি শাহভান্দি একটি আধুনিক ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারা বেন্থিক ফোরামিনিফেরা নামক এককোষী সামুদ্রিক জীবের জীবাশ্মের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে অতীতের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার পরিবর্তন পুনর্গঠন করেছেন, যা মূলত প্যালোক্লাইমেটিক প্রক্সি হিসেবে কাজ করে। এই গবেষণায় 'ফিজিক্স-ইনফর্মড ডিফিউশন মডেল' (PIDM) নামক একটি উন্নত ডিপ লার্নিং মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক মডেলটি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা পুরো প্লাইস্টোসিন এবং লেট প্লিওসিন যুগের দিনের দৈর্ঘ্যের গতিশীলতা অত্যন্ত সফলভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, গত ২.৬ মিলিয়ন বছরের কোনো হিমবাহ চক্রেই দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির হার একবিংশ শতাব্দীর শুরুর মতো এত দ্রুত বা নাটকীয় ছিল না। অধ্যাপক বেনেডিক্ট সোজা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানের এই পরিবর্তনের হার গত ৩.৬ মিলিয়ন বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। গবেষকরা আরও উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, বর্তমান শতাব্দীর শেষ নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই মন্থরতা ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী চাঁদের জোয়ার-ভাটা জনিত বাধাকেও (Lunar Tidal Braking) ছাড়িয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, এই চন্দ্রজনিত আকর্ষণই ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছিল, কিন্তু এখন মানুষের কর্মকাণ্ড সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
দিনের দৈর্ঘ্য মিলিসেকেন্ডের সামান্য অংশে বৃদ্ধি পাওয়া দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ মানুষের কাছে নগণ্য মনে হতে পারে, তবে উচ্চ-নির্ভুলতা সম্পন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার জন্য এর ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও গুরুতর। জিপিএস (GPS) সহ স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম, গভীর মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন নেটওয়ার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর জন্য পারমাণবিক ঘড়ি এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন তথ্যের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় থাকা অপরিহার্য। এই মন্থরতার কারণে স্থানাঙ্ক নির্ধারণে সামান্যতম ত্রুটিও সুক্ষ্মভাবে ক্যালিব্রেট করা সিস্টেমগুলোর কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। অতীতে পারমাণবিক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সময়ের পার্থক্য মেটাতে 'পজিটিভ লিপ সেকেন্ড' যোগ করা হতো; তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৬ সালের মধ্যেই সম্ভবত একটি 'নেতিবাচক লিপ সেকেন্ড' প্রবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এই গবেষণাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর মৌলিক ভৌত বৈশিষ্ট্যের ওপর এমন এক পরিমাপযোগ্য প্রভাব ফেলছে যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত পরিকল্পনায় নতুন করে ভাবনার অবকাশ রাখে।
5 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
Gizmodo
IFLScience
R&D World
ETV Bharat
VOL.AT
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



