যুক্তরাষ্ট্রে ‘নো কিংস’ আন্দোলনের গণজোয়ার: ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও ১৬টি দেশে বিক্ষোভের ঢেউ

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২৮ মার্চ, ২০২৬, শনিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের সাক্ষী হলো। ‘নো কিংস’ (No Kings) বা ‘রাজা নয়’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাহী ক্ষমতার অত্যধিক বিস্তার এবং স্বৈরাচারী প্রবণতার বিরুদ্ধে এই তৃতীয় দফার সমন্বিত প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। আয়োজকদের প্রত্যাশা ছিল এটি মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিক্ষোভে পরিণত হবে। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ৫ মিলিয়ন এবং অক্টোবরে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। এবার দেশজুড়ে ৩০০০-এরও বেশি সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং ধারণা করা হচ্ছে যে দেশব্যাপী অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৯ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই আন্দোলন কেবল আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক সীমানা ছাড়িয়ে ফ্রান্স, ইতালি এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অন্তত ১৬টি দেশে একযোগে পালিত হয়েছে।

এবারের আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মিনেসোটার টুইন সিটিস অর্থাৎ মিনিয়াপোলিস এবং সেন্ট পল। বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের মতে, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। বিশেষ করে কঠোর অভিবাসন নীতি এবং সম্প্রতি ফেডারেল এজেন্টদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এছাড়া ইরান বিরোধী যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলেছে, যা এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুর দিকে মিনেসোটায় পরিচালিত একটি আগ্রাসী অভিবাসন অভিযানের কারণে এই অঞ্চলটিকে বিক্ষোভের প্রধান স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সেই অভিযানে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) কর্মকর্তাদের সাথে সংঘর্ষে রেনে গুড এবং অ্যালেক্স প্রেটি নামে দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বিক্ষোভকারীদের ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। নিউইয়র্কের মিছিলে অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং প্রখ্যাত অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো অংশ নেন। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভকারীরা লিংকন মেমোরিয়ালের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদের প্রতিবাদ জানান এবং প্রশাসনের নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।

‘ইন্ডিভিবল’ (Indivisible) এবং ‘৫০৫০১’ (50501)-এর মতো সংগঠনগুলো এই আন্দোলনের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে এবং তারা তাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। ইন্ডিভিবল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিয়া গ্রিনবার্গ উল্লেখ করেছেন যে, এই আন্দোলনের সাফল্য কেবল সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আইডাহো, ওয়াইমিং, মন্টানা এবং ইউটাহ-র মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান সমর্থিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও এই প্রতিবাদের ভিত্তি ছড়িয়ে পড়া একটি বড় অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ এখন দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

হোয়াইট হাউস এই বিশাল গণবিক্ষোভের প্রতি অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। প্রশাসনের প্রেস সেক্রেটারি অ্যাবিগেইল জ্যাকসন এই সমাবেশগুলোকে ‘বামপন্থী অর্থায়নে পরিচালিত নেটওয়ার্কের’ ফসল হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এগুলোকে ‘সাইকোথেরাপি সেশন’ বলে উপহাস করেছেন। তবে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU)-এর প্রধান ডিয়ারড্রে শিফেলিং দাবি করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদগুলো কার্যকর ফলাফল বয়ে আনছে এবং প্রশাসনকে অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য করছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এই বিশাল জনসমাগম মার্কিন রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

5 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • The Guardian

  • Wikipedia

  • Reuters

  • TIME

  • States Newsroom

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।