ব্যাংক অফ জাপানের শান্ত মিটিং রুমে, যেখানে সাধারণত সতর্ক শব্দমালা শোনা যায়, এবার সেখানে এক গুমোট নীরবতা নেমে এসেছে। যখন অনেকেই সুদের হার সামান্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছিলেন, ঠিক তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থা সুদের হারে কোনো পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাত্র এক ঘণ্টা আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি নিছক কোনো যান্ত্রিক বিরতি নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি।
আমদানিকৃত তেলের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল দেশ হিসেবে জাপান পারস্য উপসাগরের যেকোনো পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। যখনই তেলবাহী ট্যাঙ্কারের গতি ধীর হয়ে যায় এবং তেলের আগাম দাম বাড়তে থাকে, তখনই জাপানে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যায়। ব্যাংক অফ জাপান (BOJ) এখানে একটি চিরন্তন উভয়সংকটের মুখোমুখি হয়েছে: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মন্দার ঝুঁকি তৈরি হয়, আবার একে অবজ্ঞা করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তবে এবার সতর্কতাই জয়ী হয়েছে। এই প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রানীতিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির সাথে সরাসরি যুক্ত করল, যা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব এশিয়ার মুদ্রাবাজারে তাৎক্ষণিকভাবে অনুভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাপানি ইয়েন দুর্বল থাকলেও, নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে এটি কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে এখন স্থিতিশীল সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে পুঁজির প্রবাহের দিক বদলে যাচ্ছে। এর ফলে দক্ষিণ কোরীয় ওন এবং তাইওয়ানিজ ডলারের মূল্যেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে যা ঘটছে, তা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই টোকিও, সিউল এবং সিঙ্গাপুরের ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে দরের ওঠানামা হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। সংকটের এই দ্রুত বিস্তারই বলে দেয় যে, বর্তমান আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলো একে অপরের সাথে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িত।
কল্পনা করুন সমুদ্রসৈকতে একদল শিশু বিশাল একটি ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। সৈকতের এক প্রান্ত থেকে বাতাসের একটি দমকা ঝাপটা এলেই পুরো ঘুড়িটি প্রবলভাবে দুলে ওঠে। ব্যাংক অফ জাপান এখন ঠিক সেই শিশুটির মতো কাজ করছে, যে দূরবর্তী অঞ্চলের ঝড়ো হাওয়ার মধ্যেও সুতার নাগাল ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ঐতিহাসিকভাবে জাপান আগেও এমন ধাক্কা সামলেছে—সত্তরের দশকের তেল সংকট এখনও জাপানি অর্থনীতিবিদদের স্মৃতিতে এক দুঃসহ ক্ষত হয়ে আছে। তখনকার জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম দেশটিকে স্থবির মুদ্রাস্ফীতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যা কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল। আজকের নীতিনির্ধারকরা স্পষ্টতই সেই শিক্ষাটি মনে রেখেছেন।
এর মূলে রয়েছে ব্যাংক অফ জাপানের সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তি। বছরের পর বছর অতি-নমনীয় মুদ্রানীতি এবং নেতিবাচক সুদের হারের পর ব্যাংক অবশেষে জরুরি অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। তবে প্রতিটি পদক্ষেপ এখন বাইরের পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সূচকের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান এই বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে জাপানকে শুধু মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাসই নয়, বরং তাদের সম্পূর্ণ জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশলও নতুন করে সাজাতে হতে পারে। সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার এই সিদ্ধান্ত দুর্বলতা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া নতুন পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এক বাস্তব স্বীকৃতি, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির ঘটনাপ্রবাহ টোকিও’র বহুতল ভবনে বসে নেওয়া সিদ্ধান্তকে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
পরিশেষে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই আপাত প্রযুক্তিগত পদক্ষেপটি একটি বৃহত্তর চিত্র ফুটিয়ে তোলে। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে কোনো বড় অর্থনীতির পক্ষেই শুধু নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্যের ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়। যখন হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যায়, তখন এশিয়ার আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের সভাকক্ষে সুদের হার, মুদ্রার বিনিময় হার এবং সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির পরিকল্পনা নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়। ব্যাংক অফ জাপানের এই নীরবতা আসলে আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের স্থিতিশীলতা কতটা ভঙ্গুর, তা উচ্চস্বরেই জানিয়ে দিচ্ছে।



