২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেজেথ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মাদক-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার লক্ষ্যে 'অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার' নামক একটি সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হয়েছে এবং এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান লাতিন আমেরিকার দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এই নতুন অভিযানটি জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন স্পিয়ার এবং ইউএস সাউদার্ন কমান্ড (SOUTHCOM)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে, যা ক্যারিবিয়ান, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার সামরিক কার্যক্রমের জন্য দায়বদ্ধ। অপারেশনটির মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমা গোলার্ধ থেকে 'নারকো-সন্ত্রাসীদের' নির্মূল করা এবং আমেরিকান ভূখণ্ডকে মাদকাসক্তি থেকে সুরক্ষিত রাখা।
এই সামরিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড-এর আগমন, যা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। ফোর্ড স্ট্রাইক গ্রুপে ক্যারিয়ার এয়ার উইং এইট-এর নয়টি বিমান স্কোয়াড্রন রয়েছে, এবং এর সাথে রয়েছে ইউএসএস বেইনব্রিজ ও ইউএসএস মহান সহ গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং ইউএসএস উইনস্টন এস. চার্চিল, যা বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কমান্ড জাহাজ হিসেবে কাজ করে। ফোর্ডের নিজস্ব ক্রু সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০, এবং এই রণতরীটি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মোতায়েন থাকা অন্যান্য আটটি নৌযানের প্রায় ৬,০০০ কর্মীর সাথে যুক্ত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, ফোর্ডের আগমনের পর অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০-এ পৌঁছেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ।
অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার-এর ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে মাদক পাচারকারী বলে অভিযুক্ত নৌযানগুলির উপর একাধিক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। মার্কিন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অভিযানগুলির ফলে ক্যারিবিয়ান এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কমপক্ষে ৭৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রশাসন এই অভিযানগুলিকে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এটিকে সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বারা ভেনেজুয়েলার কুখ্যাত গ্যাং 'ট্রেন দে আরাগুর'কে বিদেশী সন্ত্রাসী সংস্থা (FTO) হিসেবে ঘোষণা করা। এই গ্যাংটি ভেনেজুয়েলা থেকে উদ্ভূত এবং মানব পাচার, চাঁদাবাজি ও অবৈধ মাদক পাচারের মতো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ কর্তৃকও পূর্বে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধী সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই এফটিও (FTO) ঘোষণাটি সামরিক শক্তি প্রয়োগের আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার সরকার এই মার্কিন সামরিক সমাবেশকে একটি সম্ভাব্য আক্রমণ বা ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে, যার প্রতিক্রিয়ায় তারা ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদরিনো লোপেজ ঘোষণা করেছেন যে দেশের স্থল, বিমান, নৌ, নদী এবং ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলিকে সর্বোচ্চ অপারেশনাল সতর্কতায় আনা হয়েছে, যেখানে প্রায় ২,০০,০০০ সৈন্য এবং বলিভারিয়ান মিলিশিয়া বাহিনী মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে, যেখানে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো মার্কিন হামলার সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার-এর একটি অভিনব দিক হলো এটি রোবোটিক এবং স্বায়ত্তশাসিত সিস্টেমের ব্যবহারকে একীভূত করছে, যা হাইব্রিড ফ্লিট ক্যাম্পেইনের অংশ। এই উদ্যোগে দীর্ঘ সময় ধরে টহল দিতে সক্ষম রোবোটিক সারফেস ভেসেল, উচ্চ-গতির ছোট রোবোটিক ইন্টারসেপ্টর বোট এবং নজরদারির জন্য উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণকারী রোবোটিক বিমান মোতায়েন করা হবে। এই প্রযুক্তিগত সংযোজন ভবিষ্যতের নৌ অভিযানগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল এবং পদ্ধতি বিকাশে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।



