২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে রসায়ন জগতে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। টোকিও মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা, অধ্যাপক ফুমিয়াকি আমানোর নেতৃত্বে, অ্যামোনিয়া উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদ্ধতির সন্ধান দেন। এই আবিষ্কারটি রাসায়নিক শিল্পের শতবর্ষ পুরনো ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করার সম্ভাবনা রাখে।
গবেষকরা মূলত কপার অক্সাইড (Cu₂O) ভিত্তিক অনুঘটক ব্যবহার করে নাইট্রাইটগুলির তড়িৎ-রাসায়নিক বিজারণ প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা আবিষ্কার করেন যে উচ্চ দক্ষতার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে একটি 'সুপ্ত তামার সুইচ' বা 'Hidden Copper Switch'-এর মধ্যে। এটি হলো বিক্রিয়া চলাকালীন Cu₂O থেকে ধাতব তামায় (Cu⁰) একটি দশা পরিবর্তন। এই রূপান্তরটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপকে সক্রিয় করে তোলে: নাইট্রাইট আয়নের সাথে হাইড্রোজেনের সংযোজন, যার ফলস্বরূপ অ্যামোনিয়া উৎপন্ন হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটি ঘরের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপে সম্পন্ন হয়। এর বিপরীতে, ঐতিহ্যবাহী হ্যাবার-বশ প্রক্রিয়াটি চরম তাপমাত্রা ও চাপের দাবি রাখে এবং বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ১.৪% এর জন্য দায়ী।
পরিবেশ ও শক্তির ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনের প্রায় ৪০% যে অ্যামোনিয়ার ওপর নির্ভরশীল, তার প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং অত্যন্ত শক্তি-নিবিড়। নতুন এই পদ্ধতি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করে 'চাহিদা অনুযায়ী' অ্যামোনিয়া উৎপাদনের পথ খুলে দিয়েছে। এর ফলে বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হবে এবং বিদ্যুৎ গ্রিডগুলির লোড ভারসাম্য রক্ষায় নমনীয়তা আসবে। উপরন্তু, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে বৈদ্যুতিক বিভব প্রয়োগের মাধ্যমে অনুঘটকের সক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়—ধনাত্মক বিভবে সংশ্লেষণ থেমে যায় এবং ঋণাত্মক বিভবে তা দ্রুততর হয়।
এই বৈপ্লবিক গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিখ্যাত জার্নাল 'ChemSusChem'-এ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও মৌলিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তবুও প্রযুক্তিটিকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়া, অনুঘটকের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং তড়িৎ-রাসায়নিক কোষগুলির নকশা উন্নত করার মতো চ্যালেঞ্জগুলি এখনও বিদ্যমান। আগামী দিনে পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলি বাস্তব পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্ভাবন শিল্পকে কার্বনমুক্ত করার জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক বিজ্ঞান কীভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়াগুলিকে আমূল পরিবর্তন করে সেগুলিকে পরিবেশবান্ধব এবং কার্যকর করে তুলতে পারে। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে সবুজ রসায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।




