Волна - источник энергии
সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: নবায়নযোগ্য শক্তির নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: an_lymons
মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ নবায়নযোগ্য শক্তির এক অফুরন্ত কিন্তু আহরণ করা কঠিন এমন একটি উৎস। বর্তমানে প্রচলিত শক্তি উৎপাদনকারী সিস্টেমগুলো প্রায়শই কম কার্যকারিতার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, কারণ সেগুলো কেবল নির্দিষ্ট তরঙ্গ পরিসীমায় সর্বোত্তমভাবে কাজ করতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এবং সমুদ্রের শক্তিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে বিজ্ঞানীরা এখন আরও অভিযোজনযোগ্য এবং বহুমুখী প্রযুক্তির সন্ধান করছেন।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক তাকাহিতো ইদা 'জাইরোস্কোপিক ওয়েভ এনার্জি কনভার্টার' বা GWEC নামক একটি বৈপ্লবিক ধারণা বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেন। এই নতুন সিস্টেমটি বিভিন্ন কম্পাঙ্কের ঢেউ থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শক্তি শোষণ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি মূলত প্রচলিত শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর প্রধান প্রযুক্তিগত বাধাগুলো অতিক্রম করার একটি শক্তিশালী প্রচেষ্টা।
GWEC-এর মূল কার্যনীতি জাইরোস্কোপিক প্রিসেশন নামক একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রক্রিয়ায় একটি ভাসমান প্ল্যাটফর্মের ওপর একটি ঘূর্ণায়মান ফ্লাইহুইল বা চাকা স্থাপন করা হয়। সমুদ্রের ঢেউয়ের কারণে যখন প্ল্যাটফর্মটি দুলতে শুরু করে, তখন সেখানে একটি টর্ক বা ঘূর্ণন বল তৈরি হয়। এই বলটি ফ্লাইহুইলের ঘূর্ণন অক্ষকে বিচ্যুত বা প্রিসেশন ঘটাতে বাধ্য করে, যা সরাসরি একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরকে সচল করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।
গবেষক তাকাহিতো ইদা তার এই উদ্ভাবনের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য বিস্তারিত তাত্ত্বিক এবং গাণিতিক বিশ্লেষণ পরিচালনা করেছেন। তিনি লিনিয়ার ওয়েভ থিওরি ব্যবহার করে পানি, ভাসমান কাঠামো এবং জাইরোস্কোপের মধ্যকার জটিল মিথস্ক্রিয়া সিমুলেট করেছেন। তার এই গবেষণার ফলাফল বিখ্যাত 'Journal of Fluid Mechanics'-এ প্রকাশিত হয়েছে, যা এই প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আরও মজবুত করেছে।
গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সঠিক টিউনিং বা বিন্যাসের মাধ্যমে GWEC তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শক্তি রূপান্তর দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই উচ্চ দক্ষতা অর্জনের জন্য সিস্টেমটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট রেজোন্যান্স বা অনুনাদ অবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় না। এটি সমুদ্রের বিভিন্ন ধরনের ঢেউয়ের কম্পাঙ্কেও ধারাবাহিকভাবে শক্তি উৎপাদন করতে পারে, যা একে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।
জাইরোস্কোপিক এই পদ্ধতির স্থায়িত্ব পরীক্ষার জন্য উন্নত গাণিতিক মডেলিং ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, প্রতিকূল সামুদ্রিক পরিবেশেও সিস্টেমটি তার কার্যকারিতা বজায় রাখতে সক্ষম। বিশেষ করে নন-লিনিয়ার জাইরোস্কোপিক রেসপন্স বা প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে, এই মডেলটি দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল শক্তি সংগ্রহের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান হতে পারে।
প্রচলিত সামুদ্রিক শক্তি রূপান্তরকারী যন্ত্রগুলোর তুলনায় GWEC-এর বেশ কিছু কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। এটি সমুদ্রের পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত ঢেউয়ের মধ্যেও উচ্চমাত্রার শক্তি শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে পারে। এছাড়া, এই সিস্টেমের নকশাটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং কম্প্যাক্ট, যার ফলে এটি বড় জাহাজের ভেতরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য স্থাপন করা সম্ভব।
গবেষক দলটি বর্তমানে এই প্রযুক্তিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাদের আগামী দিনের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- একটি ১০০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের কৃত্রিম জলাধারে পরীক্ষার জন্য ৫০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ছোট প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করা।
- বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য ৩০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি বিশেষ জেনারেটর তৈরি করা, যা জাহাজের মূল শক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য শক্তির বাজার বর্তমানে এক অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বাজারের মোট আকার ১.৭৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক শক্তিকে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাকাহিতো ইদার এই গবেষণাটি সামুদ্রিক শক্তিকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তার একটি অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যান্য প্রচলিত প্রযুক্তি যেমন পয়েন্ট অ্যাবজরবার বা অসিলেটিং ওয়াটার কলামের সাথে তুলনা করলে GWEC-এর শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সিস্টেমের জেনারেটরসহ সমস্ত সংবেদনশীল যান্ত্রিক অংশগুলো একটি মজবুত কাঠামোর ভেতরে সুরক্ষিত থাকে। এর ফলে লোনা পানির ক্ষয়কারী প্রভাব এবং যান্ত্রিক ঘর্ষণজনিত ক্ষতির ঝুঁকি অনেক কমে যায়, যা সমুদ্রের রুক্ষ পরিবেশে যন্ত্রটির দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
উৎসসমূহ
Physics World
Asia Research News |
Space Daily
Noticias Ambientales
