রেলপথে সৌরশক্তি: অস্ট্রেলিয়ার বায়রন বে সোলার ট্রেনের আখ্যান
লেখক: an_lymons
অস্ট্রেলিয়ার মনোরম উপকূলীয় অঞ্চল নিউ সাউথ ওয়েলসে এক যুগান্তকারী পরিবহন ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে—এটি হলো 'বায়রন বে সোলার ট্রেন' (Byron Bay Solar Train)। এটি বিশ্বের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন যা মূলত সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। এই প্রকল্পটি কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক নয়, বরং এটি একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ যে কীভাবে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রচলিত পরিবহন ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে।
সৃষ্টির কালানুক্রম
সম্পূর্ণ সৌরশক্তিনির্ভর ট্রেন তৈরির ধারণাটি প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ২০১৩ সালে। সেই সময়ে, বায়রন বে রেলওয়ে কোম্পানি (Byron Bay Railroad Company) পরিত্যক্ত তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেললাইন অধিগ্রহণ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল এই পুরোনো লাইনটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করা এবং প্রদর্শন করা যে কীভাবে টেকসই উন্নয়নের প্রযুক্তি মানুষ ও প্রকৃতির সেবায় নিয়োজিত হতে পারে।
পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। একটি পুরোনো ১৯৪৯ সালের ডিজেল ট্রেনকে পুনরুদ্ধার করে সেটিকে হাইব্রিড মডেলে রূপান্তরিত করা হয়। এর একটি ইঞ্জিন বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং ট্রেনের ছাদে সৌর প্যানেল বসানো হয়, যা ব্যাটারি চার্জ করার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
বায়রন বে সোলার ট্রেনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। সেই থেকে, ট্রেনটি বায়রন বিচ (Byron Beach) এবং নর্থ বিচ (North Beach) স্টেশন দুটির মধ্যে নিয়মিত চলাচল করছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের পরিষেবা প্রদান করছে।
প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা
ট্রেনের ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেলগুলোর ক্ষেত্রফল প্রায় ৬.৫ বর্গমিটার। এই প্যানেলগুলো এমন পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যা ট্রেনের মোট শক্তির চাহিদার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে সক্ষম। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ৭৭ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) ক্ষমতার ব্যাটারিতে সঞ্চিত থাকে। এই সঞ্চিত শক্তি ট্রেনটিকে মেঘলা আবহাওয়া বা রাতেও চলতে সাহায্য করে।
ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ১০০ জন যাত্রী বহন করতে পারে। অতিরিক্ত নির্ভরযোগ্যতার জন্য, নর্থ বায়রন ডিপোতে অবস্থিত একটি স্থায়ী সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও এই সিস্টেমে শক্তি সরবরাহ করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রেকিং করার সময় রেজেনারেটিভ প্রযুক্তির মাধ্যমে কিছু শক্তি পুনরায় সিস্টেমে ফেরত আসে, যা দক্ষতা বৃদ্ধি করে এবং ব্যাটারির আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে তোলে।
প্রকল্পের তাৎপর্য
যদিও এই রুটের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩ কিলোমিটার, বায়রন বে সোলার ট্রেন প্রমাণ করেছে যে সৌরশক্তি কীভাবে একটি পরিচ্ছন্ন, শান্ত এবং কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা প্রদান করতে পারে। এই প্রকল্পটি বিশ্বজুড়ে শহরগুলোকে অনুরূপ সমাধান গ্রহণে উৎসাহিত করেছে এবং এটি টেকসই গতিশীলতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে এই ট্রেন কেবল একটি সুবিধাজনক যাতায়াতের মাধ্যম নয়। এটি এক জীবন্ত প্রমাণ যে নবায়নযোগ্য শক্তি আজই জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হতে পারে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এবং শহরের পরিবেশের মান উন্নত করে।
বায়রন বে সোলার ট্রেন দেখিয়ে দিচ্ছে যে সূর্যরশ্মি কেবল আলোর উৎস নয়, এটি এমন এক চালিকাশক্তি যা মানবজাতিকে গ্রহের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
16 দৃশ্য
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?
আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
