
এআই এখন খোঁজার পরিবর্তে উত্তর তৈরি করে।
শেয়ার করুন
লেখক: Aleksandr Lytviak

এআই এখন খোঁজার পরিবর্তে উত্তর তৈরি করে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে এক আমূল এবং মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মোট সার্চ সেশনের প্রায় ৭২ শতাংশেরও বেশি কোনো বাহ্যিক ওয়েবসাইটে ক্লিক করা ছাড়াই সম্পন্ন হচ্ছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বে 'জিরো-ক্লিক সার্চ' (Zero-Click Searches) নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে গুগলের 'এআই ওভারভিউ' (AI Overviews) ফিচার। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিটি এখন ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর সরাসরি সার্চ রেজাল্ট পেজেই প্রদান করছে, যার ফলে তথ্যের মূল উৎসে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যবহারকারীদের কাছে ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।
বিশেষ করে তথ্যমূলক এবং শিক্ষামূলক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও প্রকটভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই ধরনের সার্চের ক্ষেত্রে জিরো-ক্লিক রেট বা ক্লিক না করার হার প্রায় ৮৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে গুগল বা অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনগুলো এখন আর কেবল তথ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার 'মাধ্যম' হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা নিজেরাই তথ্যের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থলে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্যবহারকারীরা এখন আর দীর্ঘ সময় ব্যয় করে বিভিন্ন লিঙ্কে ক্লিক করে তথ্য খুঁজতে আগ্রহী নন, বরং তারা স্ক্রিনে আসা সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর উত্তরটিকেই গ্রহণ করছেন।
ব্যবহারকারীদের এই পরিবর্তনশীল আচরণের সত্যতা পাওয়া গেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণধর্মী সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যেও। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত 'সিমিলারওয়েব' (Similarweb)-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, যেসব সার্চ রেজাল্ট পেজে এআই-ভিত্তিক সারসংক্ষেপ বা সামারি উপস্থিত থাকে, সেখানে সাধারণ লিঙ্কগুলোর অর্গানিক ক্লিক-থ্রু রেট (CTR) প্রায় ৬১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে বিটুবি (B2B) প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলো এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ এআই এখন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি একক এবং সংক্ষিপ্ত টেক্সট হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে।
তবে এই ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্যেও বাণিজ্যিক বা লেনদেন সংক্রান্ত (Transactional) সার্চগুলো কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। পণ্য ক্রয় বা নির্দিষ্ট কোনো সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের এখনও সংশ্লিষ্ট অনলাইন শপ বা ই-কমার্স পোর্টালগুলোতে প্রবেশ করতে হয়। কারণ এআই কোনো পণ্যের গুণাগুণ বর্ণনা করতে পারলেও, সরাসরি কেনাকাটার চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য ব্যবহারকারীকে এখনও মূল ওয়েবসাইটের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে এই খাতে ট্রাফিক হ্রাসের হার তুলনামূলকভাবে কম।
বর্তমান এই সংকটময় সময়কে শিল্প বিশেষজ্ঞরা 'দ্য গ্রেট ডিসকানেক্ট' বা 'মহা বিচ্ছিন্নতা' হিসেবে অভিহিত করছেন। এটি একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি যেখানে সার্চ ইঞ্জিনের জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহারের হার ক্রমবর্ধমান, অথচ ওয়েবসাইটগুলোতে অর্গানিক ট্রাফিক আসার হার নিম্নমুখী। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিশ্বের বড় বড় প্রকাশক এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দীর্ঘদিনের ডিজিটাল কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা এখন প্রথাগত সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন বা এসইও (SEO) থেকে সরে এসে 'এইও' (AEO - Answer Engine Optimization) বা উত্তর ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের দিকে মনোনিবেশ করছেন।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের এই নতুন যুগে 'সার্চে জয়ী হওয়া' মানে এখন আর ব্যবহারকারীকে নিজের ওয়েবসাইটে নিয়ে আসা নয়। বরং এআই-এর তৈরি করা উত্তরের ভেতরে নিজের ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কোনো উত্তর জেনারেট করবে, তখন সেখানে আপনার ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ থাকাই হবে সফলতার নতুন মাপকাঠি। এই বিবর্তন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং মার্কেটারদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, যেখানে তথ্যের নির্ভুলতা এবং প্রামাণ্যতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
deepmarketing