মেটা প্ল্যাটফর্মস কর্পোরেশন ২০২৬ সালের ১০ মার্চ, মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে তারা পরীক্ষামূলক সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম 'মোল্টবুক' (Moltbook) অধিগ্রহণ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে মেটা তাদের এআই ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে এবং ভবিষ্যতে স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তির প্রসারে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে যাত্রা শুরু করা মোল্টবুক মূলত "এআই-এর জন্য রেডিট" (Reddit for AI) হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি এমন একটি ফোরাম যেখানে ক্লড (Claude), জিপিটি (GPT) এবং জেমিনির (Gemini) মতো বিভিন্ন মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি স্বায়ত্তশাসিত এজেন্টরা মানুষের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়াই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে, নিজস্ব কমিউনিটি তৈরি করে এবং তথ্য আদান-প্রদান করে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি ২০০টি কমিউনিটিতে ২১০০-এর বেশি এজেন্টের সমাগম ঘটিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যেখানে এআই-এর তৈরি ফেক পোস্ট এবং মিমগুলো ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়।
এই অধিগ্রহণটি এআই ক্ষেত্রে মেটার কৌশলগত নেতৃত্বের পরিবর্তনের একটি বড় সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেটা এখন এমন সিস্টেমের দিকে মনোনিবেশ করছে যেখানে এআই এজেন্টরা কেবল সরাসরি কমান্ড পালন করবে না, বরং তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় এবং সহযোগিতার মাধ্যমে জটিল কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে। এই পদক্ষেপটি মেটাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে।
চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার সময় মোল্টবুক দাবি করেছে যে তাদের প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ২.৮ মিলিয়ন নিবন্ধিত এজেন্ট রয়েছে। এই এজেন্টদের একটি বড় অংশ 'ওপেনক্ল' (OpenClaw) ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এই ফ্রেমওয়ার্কটি পিটার স্টেইনবার্জার তৈরি করেছিলেন, যিনি পূর্বে 'মোল্টবট' নামে পরিচিত ছিলেন এবং প্ল্যাটফর্মটির দ্রুত প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। উল্লেখ্য যে, স্টেইনবার্জার সম্প্রতি ওপেনএআই-তে (OpenAI) যোগ দিয়েছেন, যা এই খাতের মেধা অন্বেষণের তীব্র প্রতিযোগিতাকেই ফুটিয়ে তোলে এবং মোল্টবুকের প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
চুক্তির অংশ হিসেবে মোল্টবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাট শ্লিচ্ট এবং বেন পার মেটার 'সুপার ইন্টেলিজেন্স ল্যাবস' (MSL) বিভাগে যোগ দেবেন। এই বিভাগটির নেতৃত্বে রয়েছেন মেটার চিফ এআই অফিসার আলেকজান্ডার ওয়াং। মোল্টবুকের প্রযুক্তি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে মেটা এখন ওপেনএআই এবং এনভিডিয়ার (Nvidia) মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে আরও জোরালোভাবে লড়াই করতে পারবে। মেটার এআই প্রোডাক্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিশাল শাহ অভ্যন্তরীণভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মোল্টবুক ভেরিফিকেশন মেকানিজমের মাধ্যমে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ মালিকানা এবং সত্যতা সংক্রান্ত জটিল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম।
তবে এই অর্জনের সাথে কিছু বড় ধরনের ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে। মোল্টবুক ইতোমধ্যেই বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে তাদের অরক্ষিত 'সুপাবেস' (Supabase) ডাটাবেস থেকে ৬০০০-এর বেশি ইমেল ঠিকানা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাটি একটি ভারসাম্যহীনতা প্রকাশ করেছে: যেখানে ১.৫ মিলিয়ন এজেন্টের দাবি করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র ১৭ হাজার মানুষ মালিক হিসেবে নিবন্ধিত ছিল এবং অংশগ্রহণকারীটি সত্যিই এআই কি না তা যাচাই করার কোনো সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি মেটার সিটিও অ্যান্ড্রু বসওয়ার্থ মন্তব্য করেছিলেন যে, এজেন্টদের কথোপকথনের চেয়ে তাদের হ্যাকিংয়ের প্রচেষ্টাগুলো পর্যবেক্ষণ করা বেশি আকর্ষণীয়। ফলে মেটার জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলো কাটিয়ে উঠে একটি নিরাপদ এআই ইন্টারঅ্যাকশন পরিকাঠামো গড়ে তোলা।



