মোনা ফাস্টভোল্ডের পরিচালনায় নির্মিত ঐতিহাসিক মিউজিক্যাল ড্রামা ‘দ্য টেস্টামেন্ট অফ অ্যান লি’ (The Testament of Anne Lee) ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের সিনেমা হলগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেয়েছে। এই চলচ্চিত্রটি মূলত শেকার আন্দোলনের কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠাতা অ্যান লি-র জীবন ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। অস্কার মনোনীত অভিনেত্রী আমান্ডা সেফ্রিড এই ছবিতে ‘মাদার অ্যান লি’-র কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সিনেমাটিতে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার থেকে তার জীবনের শুরু এবং পরবর্তীতে লিঙ্গ সমতা ও শান্তিবাদ নিয়ে তার বৈপ্লবিক ও আমূল পরিবর্তনকামী চিন্তাধারার বিবর্তন অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিচালক ফাস্টভোল্ড এই চলচ্চিত্রটিকে এই বিতর্কিত ধর্মীয় নেত্রীর জীবনের একটি ‘কাল্পনিক পুনর্নির্মাণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সম্পূর্ণ সিনেমাটি ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মে ধারণ করা হয়েছে, যা দর্শকদের একটি ধ্রুপদী আমেজ প্রদান করে। এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর অনন্য সাউন্ডট্র্যাক, যা শেকারদের ঐতিহ্যবাহী স্তোত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেছেন প্রখ্যাত সুরকার ড্যানিয়েল ব্লুমবার্গ। ব্লুমবার্গ, যিনি এর আগে ‘দ্য মোস্ট ভায়োলেন্ট ম্যান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার জয় করেছিলেন, এই প্রজেক্টের শুরু থেকেই পরিচালকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি একটি আভা-গার্ড বা আধুনিক সংগীত আবহ তৈরির লক্ষ্যে দশটি ঐতিহ্যবাহী শেকার স্তোত্র এবং তিনটি মৌলিক সুর ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে আমান্ডা সেফ্রিডের সাথে তার গাওয়া ‘ক্লোদড বাই দ্য সান’ (Clothed by the Sun) নামক দ্বৈত গানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবির কাহিনীতে লি-র ব্রহ্মচর্য পালনের কঠোর নীতি এবং পরবর্তীতে আমেরিকায় তার অভিবাসনের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, যেখানে তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
অ্যান লি ১৭৩৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ক্যারিশম্যাটিক নেত্রী, যার লিঙ্গ সমতা এবং বিবাহ বর্জনের সাহসী ধারণা তাকে সমসাময়িক কোয়েকার সম্প্রদায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছিল। ১৭৭৪ সালে তিনি তার আটজন অনুসারীকে নিয়ে ইংল্যান্ড ত্যাগ করেন এবং ১৭৭৬ সালে নিউ ইয়র্কের নিস্কায়ুনায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি একটি নতুন ধর্মীয় সমাজ বা ‘মিলেনিয়াল চার্চ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ঈশ্বরের দ্বৈত সত্তা—অর্থাৎ ঈশ্বর একই সাথে পুরুষ ও নারী—এমন বৈপ্লবিক ধারণা প্রচারের কারণে তিনি ১৮০০ সালের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতেগোনা কয়েকজন নারী ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে পরিচিতি পান। তার ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি, বিশেষ করে আব্রাহামের (ক্রিস্টোফার অ্যাবট) সাথে তার যন্ত্রণাদায়ক দাম্পত্য এবং চার সন্তানের অকাল মৃত্যু, তাকে পাপ থেকে মুক্তির পথ হিসেবে ব্রহ্মচর্যের ওপর জোর দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। চলচ্চিত্রে এই মানসিক আঘাতের দৃশ্যগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি প্রসবের দৃশ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা তার জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
সেলিয়া রাউলসন-হলের কোরিওগ্রাফিতে এই সিনেমাটিতে ব্যাখ্যামূলক নাচ এবং গানের চমৎকার ব্যবহার করা হয়েছে। এটি শেকারদের উপাসনার বিশেষ ধরন, যা নাচ এবং শরীরের কম্পনের মাধ্যমে এক ধরনের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা তৈরি করত, তা দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে তুলেছে। পেনসিলভানিয়ায় জন্মগ্রহণকারী অভিনেত্রী আমান্ডা সেফ্রিড এই চলচ্চিত্রে এমন এক অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়েছেন যা সমালোচকদের মতে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ‘সেরা অভিনয়’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সেফ্রিড ছাড়াও এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন থমাসিন ম্যাকেঞ্জি, লুইস পুলম্যান, স্ট্যাসি মার্টিন এবং ক্রিস্টোফার অ্যাবট। প্রেক্ষাগৃহে সফলভাবে চলার পর, ২০২৬ সালের ১০ মার্চ ছবিটির ডিজিটাল সংস্করণ মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছে এই ঐতিহাসিক আখ্যানকে পৌঁছে দেবে।



