আমস্টারডামে উন্মোচিত হলো টাইরানোসরাস রেক্সের কোলাজেন থেকে তৈরি বিশ্বের প্রথম চামড়ার ব্যাগ

সম্পাদনা করেছেন: Katerina S.

২০২৬ সালের ২ এপ্রিল আমস্টারডাম এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল। সেখানে বিশ্বের প্রথম টি-রেক্স লেদার™ (T-Rex Leather™) নামক পেটেন্ট করা উপাদান দিয়ে তৈরি একটি অত্যন্ত মার্জিত এবং বিলাসবহুল লেডিস হ্যান্ডব্যাগ উন্মোচন করা হয়েছে। এই অনন্য ফ্যাশন অনুষঙ্গটি তৈরি করেছে আধুনিক ও উদ্ভাবনী ব্র্যান্ড 'এনফিন লেভে' (Enfin Levé)। আমস্টারডামের বিখ্যাত আর্ট জু (Art Zoo) মিউজিয়ামে আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি মূলত প্রাগৈতিহাসিক জীববিজ্ঞান এবং ভবিষ্যতের উন্নত বস্তুবিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই উদ্যোগটি ফ্যাশন জগতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে যেখানে বিলুপ্ত প্রাণীর ডিএনএ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছে।

এই টি-রেক্স লেদার™ তৈরির প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং বিজ্ঞাননির্ভর, যাতে উন্নত কম্পিউটেশনাল মডেলিংয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। গবেষকরা টাইরানোসরাস রেক্সের জীবাশ্ম থেকে সংগৃহীত কোলাজেনের ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কম্পিউটেশনাল বায়োলজির মাধ্যমে এর হারিয়ে যাওয়া জেনেটিক তথ্যগুলো পুনর্গঠন করেছেন। এরপর এই সংগৃহীত তথ্যগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করা কোষের মধ্যে সফলভাবে স্থাপন করা হয়। এই কোষগুলোকে পরবর্তীতে টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের 'স্ক্যাফোল্ড-ফ্রি' বা কাঠামোমুক্ত প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে কালচার করা হয়। এর ফলে কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবেই এমন একটি গঠন তৈরি করে যা দেখতে এবং গুণগত মানে প্রচলিত পশুর চামড়ার মতোই টেকসই।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশেষজ্ঞ বায়োটেকনোলজি সংস্থা 'দ্য অর্গানয়েড কোম্পানি' (The Organoid Company), টেকসই বায়োটেকনোলজির অন্যতম পথিকৃৎ 'ল্যাব-গ্রোন লেদার লিমিটেড' (Lab-Grown Leather Ltd. - যা BSF এন্টারপ্রাইজ পিএলসি-র একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান) এবং বৈশ্বিক সৃজনশীল সংস্থা 'ভিএমএল' (VML - যা WPP পিএলসি গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত)। মিশাল হাদাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এনফিন লেভে-র ডিজাইনাররা এই উপাদানটির নমনীয়তা এবং প্রসারণ ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তাদের এই 'ম্যাটেরিয়াল-ওরিয়েন্টেড' বা উপাদান-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই ব্যাগটিকে একটি অনন্য শৈল্পিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে।

ফিরোজা বা টারকোয়েজ রঙের এই বিশেষ হ্যান্ডব্যাগটি বর্তমানে আমস্টারডামের হেরেনগ্রাখট ৩৬৮ ঠিকানায় অবস্থিত আর্ট জু মিউজিয়ামে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা ২০২৬ সালের ১১ মে পর্যন্ত এই বিস্ময়কর সৃষ্টিটি দেখার সুযোগ পাবেন। ব্যাগটিকে মিউজিয়ামে থাকা একটি পূর্ণাঙ্গ টি-রেক্স কঙ্কালের পাশেই স্থাপন করা হয়েছে, যা ন্যাচারালিস বায়োডাইভারসিটি সেন্টার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এই প্রদর্শনীটি শেষ হওয়ার পর ব্যাগটি একটি নিলামে তোলা হবে। নিলামে এই ব্যাগটির প্রাথমিক বা প্রারম্ভিক মূল্য ধরা হয়েছে ৫,৭৫,০০০ ইউরোরও বেশি, যা এর ঐতিহাসিক এবং প্রযুক্তিগত গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।

টি-রেক্স লেদার™ উৎপাদনের এই বিশেষ পদ্ধতিটি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এতে প্রথাগত চামড়া প্রক্রিয়াকরণের মতো ক্ষতিকারক ক্রোমিয়াম ট্যানিংয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না এবং কোনো প্রাণীকে হত্যা করারও প্রশ্ন ওঠে না। এটি সম্পূর্ণভাবে সার্কুলার ডিজাইনের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এই উপাদানটি কেবল বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীলই নয়, বরং এটি দীর্ঘকাল ব্যবহারের উপযোগী এবং প্রয়োজনে মেরামতযোগ্য। এছাড়া এর প্রতিটি ধাপের উৎস বা ট্র্যাকিং করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিটি অটোমোবাইল শিল্পের সিট কভার এবং ঘরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজেও বড় পরিসরে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এই বিশাল প্রযুক্তিগত অর্জনের মাঝেও কিছু বিজ্ঞানী ও জীবাশ্মবিদ তাদের সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, জীবাশ্মে পাওয়া কোলাজেনের অবশিষ্টাংশ থেকে টি-রেক্সের চামড়ার প্রকৃত গঠন হুবহু পুনর্নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। তা সত্ত্বেও দ্য অর্গানয়েড কোম্পানির সিইও থমাস মিচেল আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন যে, এই প্রকল্পটি সিন্থেটিক বায়োলজির মাধ্যমে টেকসই উদ্ভাবনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই খবরের প্রভাবে লন্ডনের শেয়ার বাজারে বিএসএফ এন্টারপ্রাইজ পিএলসি-র শেয়ারের দাম এক লাফে ৬৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল চামড়ার পণ্যের বাজার প্রায় ৭৮০ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে এই নতুন প্রযুক্তি এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

10 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Adformatie Online

  • DAWN.COM

  • VML

  • Tuoi tre news

  • India Today

  • Amsterdam Today

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।