ওটারমেনি জিন থেরাপি অনুমোদনের বিষয়ে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ-র সিদ্ধান্ত চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এফডিএ-র সরকারি প্রতিবেদন এবং ভক্স-এর তথ্য অনুযায়ী, বিরল বংশগত শ্রবণশক্তি হ্রাসের চিকিৎসায় জিন থেরাপি ব্যবহারের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুমতি। ওষুধটি তৈরি করেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান রিজেনারন। এর মূল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল 'কর্ড' (CHORD) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং স্পেনের একাধিক কেন্দ্রে পরিচালিত হয়েছে। পরবর্তীতে চীনের একটি মাল্টিসেন্টার গবেষণার ফলাফল 'নেচার' জার্নালে প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, এই ওষুধটি মূলত সুনির্দিষ্ট জেনেটিক মিউটেশন থাকা রোগীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ওটারফেরলিন প্রোটিন তৈরির জন্য দায়ী ওটিওএফ (OTOF) জিনের ত্রুটি সংশোধনের লক্ষ্যেই ওটারমেনি থেরাপি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই প্রোটিনের অনুপস্থিতিতে কানের ভেতরের লোমযুক্ত কোষগুলো শব্দের কম্পনকে স্নায়বিক সংকেতে রূপান্তর করতে পারে না, যার ফলে জন্ম থেকেই গুরুতর বধিরতা দেখা দেয়।
এর কার্যপ্রণালী অনেকটা একটি অচল যন্ত্রের ভেতরে সঠিক নির্দেশিকা পৌঁছে দেওয়ার মতো। জিনের একটি সুস্থ সংস্করণকে অ্যাডেনো-অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাল ভেক্টরের মাধ্যমে কানের উদ্দিষ্ট কোষগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়, যা প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। এটি শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে কানের ভেতরে ককলিয়ায় একটিমাত্র ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়, যা শরীরের ওপর বাড়তি ধকল কমিয়ে দেয়।
কর্ড (CHORD) ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক তথ্য অংশগ্রহণকারীদের শ্রবণশক্তি উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এফডিএ-র আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য বিবেচিত ২০ জন রোগীর মধ্যে ৮০ শতাংশের শ্রবণশক্তি থেরাপির পর উন্নত হয়েছে। নেচার-এ প্রকাশিত অতিরিক্ত একটি গবেষণায় ৯০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর শ্রবণশক্তি ফিরে আসার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
একজন অংশগ্রহণকারীর শ্রবণশক্তি স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে গড় মাত্রা ছিল প্রায় ৩৭ ডেসিবেল। যেসব শিশু আগে কোনো শব্দে সাড়া দিত না, থেরাপির পর তারা বাবা-মায়ের কণ্ঠ শুনে মাথা ঘোরাতে শুরু করে এবং বিভিন্ন স্বর আলাদা করতে সক্ষম হয়।
ভক্স বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, এই ধরনের পরিবর্তন শুধুমাত্র ওটিওএফ (OTOF) মিউটেশন নিশ্চিত হওয়া দলগুলোর মধ্যেই দেখা গেছে। বাস্তব ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদী পূর্ণাঙ্গ ফলাফল কেমন হবে, তা এখনও যাচাই করা বাকি।
বিভিন্ন উৎসের বিশ্লেষণ থেকে একটি গভীর বিষয় উঠে এসেছে: এই অনুমোদন মূলত শুধুমাত্র উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা থেকে সরে এসে সরাসরি জেনেটিক ত্রুটি দূর করার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিফলন। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি আদর্শ মডেল হিসেবে কাজ করছে, যেখানে আমেরিকার কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং এশীয় গবেষণাগারগুলোর বিশাল সক্ষমতার এক মেলবন্ধন ঘটেছে।
চোখের রেটিনার চিকিৎসার মতো অন্যান্য জিন থেরাপির সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ভক্স ওটারমেনিকেও দেখছে এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়জনিত সমস্যার সমাধানে এর সম্ভাবনার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে গিয়ে তারা মূলত পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট উপাত্ত এবং অনুমোদনের সরকারি মানদণ্ডগুলোর দিকেই আলোকপাত করছে।
জিন চিকিৎসার এই অগ্রগতি বংশগত বধিরতার শিকার পরিবারগুলোর জন্য শৈশবেই দ্রুত চিকিৎসার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। যেসব শিশু জন্ম থেকেই সম্পূর্ণ বধির ছিল, এখন তাদের কথা বলা শিখতে পারা এবং সমাজে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।




