
জীববিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত: চুল কি আসলে নিচ থেকে ঠেলে বড় হয়, নাকি ওপরের দিকে ‘টেনে’ তোলা হয়?
লেখক: Aleksandr Lytviak

দশক ধরে জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবইগুলোতে শেখানো হয়েছে যে, চুলের গোড়ায় নতুন কোষের চাপে চুল ওপরের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আসে। তবে লরিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন (L'Oréal Research & Innovation) এবং কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের (Queen Mary University of London) বিজ্ঞানীদের এক সাম্প্রতিক গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। 'নেচার কমিউনিকেশনস' (Nature Communications) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, চুল আসলে একটি জটিল কোষীয় 'ট্রাক্টর' বা আণুবীক্ষণিক মোটরের মাধ্যমে ওপরের দিকে উঠে আসে। এই আবিষ্কার মানুষের শারীরবৃত্তীয় জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি টাক সমস্যার সমাধানে রাসায়নিক চিকিৎসার বদলে যান্ত্রিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে নতুন পথ দেখাবে।
গবেষকরা মানুষের জীবন্ত চুলের ফলিকলের ভেতর প্রতিটি কোষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে অত্যাধুনিক 'রিয়েল-টাইম থ্রিডি মাইক্রোস্কোপি' (3D-microscopy in real-time) প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তারা লক্ষ্য করেছেন যে, চুলের বাইরের মূল আবরণী বা আউটার রুট শিথের কোষগুলো স্থির নয়; বরং এগুলো একটি সর্পিল বা স্পাইরাল পথে নিচের দিকে নামতে থাকে। কোষগুলোর এই সুসংগত চলন একটি যান্ত্রিক টান বা ট্রাকশন তৈরি করে, যা চুলের গোড়াকে আঁকড়ে ধরে ত্বকের উপরিভাগের দিকে টেনে তোলে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াটিকে একটি কনভেয়র বেল্ট বা বায়োলজিক্যাল মোটরের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে কেবল কোষ বিভাজন নয়, বরং কোষের চলনই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
নিজেদের এই নতুন তত্ত্বটি প্রমাণ করার জন্য গবেষণা দলটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। প্রথম পরীক্ষায় তারা চুলের ফলিকলে কোষ বিভাজন বা মাইটোসিস (mitosis) প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেন। প্রচলিত 'ঠেলে বের করার' তত্ত্বটি সঠিক হলে চুল পড়া বা বৃদ্ধি তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেল, কোষ বিভাজন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও চুল প্রায় আগের গতিতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিতীয় পরীক্ষায় তারা 'অ্যাক্টিন' (actin) নামক একটি প্রোটিনকে ব্লক করে দেন, যা কোষের সংকোচন ও চলনের জন্য দায়ী। এর ফলে চুলের বৃদ্ধির হার ৮০ শতাংশের বেশি কমে যায়। এই পরীক্ষাটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, কোষীয় চাপ নয় বরং সক্রিয় যান্ত্রিক টানই হলো চুলের বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।
চুল পড়া রোধ বা হেয়ার লস ইন্ডাস্ট্রির জন্য এই আবিষ্কার একটি আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। বর্তমানে মিনোক্সিডিলের মতো প্রচলিত ওষুধগুলো মূলত রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি বা কোষ বিভাজন ত্বরান্বিত করার ওপর কাজ করে। তবে নতুন এই তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অ্যালোপেসিয়া বা টাক সমস্যার ক্ষেত্রে চুলের ফলিকলের এই 'মোটর' কার্যকারিতা বা চুলকে ওপরের দিকে তোলার যান্ত্রিক ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন এমন অণু বা মলিকিউল খোঁজার চেষ্টা করছেন যা এই কোষীয় মোটরগুলোকে পুনরায় সচল বা 'রিচার্জ' করতে সক্ষম। এটি সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আশার আলো হতে পারে যাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কার্যকর হচ্ছে না।
এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এটি মানুষের শরীরের জটিল মেকানিজম বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চুলের বৃদ্ধিকে এখন আর কেবল একটি জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হবে না, বরং একে একটি সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ভবিষ্যতে চুলের যত্নে এমন সব পণ্য বা থেরাপি আসতে পারে যা সরাসরি এই আণুবীক্ষণিক মোটরগুলোকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হবে। এর ফলে চুলের ঘনত্ব বাড়ানো এবং অকাল পক্কতা বা চুল পড়া রোধে আরও নিখুঁত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
21 দৃশ্য
উৎসসমূহ
ScienceDaily
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



