কেন্দ্রীয় নরওয়ের উপকূলবর্তী অরলান্ড পৌরসভার ওকসভল এলাকার গ্রামীণ অঞ্চল ভ্যাল-এ প্রত্নতাত্ত্বিকরা ভাইকিং যুগের এক অস্বাভাবিক নারী সমাধির সন্ধান পেয়েছেন। নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (NTNU) বিজ্ঞান জাদুঘরের একটি দল এই গুরুত্বপূর্ণ খননকার্য পরিচালনা করে। এই সমাধিটি মাটির খুব কাছাকাছি, মাত্র ১৫–২০ সেন্টিমিটার গভীরে অবস্থিত ছিল। এত কম গভীরতার কারণে আধুনিক কৃষিকাজের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে ছিল।
Unique Burial of a Viking Woman Discovered in Norway dagbladet.no/nyheter/mystis…
মৃতদেহের সাথে পাওয়া অলঙ্কারাদি এবং অন্যান্য নিদর্শন বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনুমান করছেন যে এই সমাধিটি প্রায় নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তৈরি হয়েছিল। এই নারীর পোশাকে ডিম্বাকৃতির ফিবুলা (ওভাল ব্রোচ) অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সমাজে এই ধরনের ফিবুলা ছিল উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, বিবাহিত বা স্বাধীন নারীদের পোশাকের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এই আবিষ্কার দৃঢ়ভাবে ইঙ্গিত দেয় যে তিনি একটি ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং সম্ভবত ভ্যাল খামারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
Unique Burial of a Viking Woman Discovered in Norway dagbladet.no/nyheter/mystis…
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক এবং অনন্য অংশটি হলো দুটি বিশাল সামুদ্রিক স্ক্যালপ (ঝিনুক)। এগুলো মৃতদেহের নিচের চোয়ালের দুপাশে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছিল যেন তারা আংশিকভাবে মুখ ঢেকে রেখেছে। নরওয়ের ভাইকিং সমাধিস্থলে এর আগে কখনও এমন ধরনের আচারিক উপাদান বা সজ্জা নথিবদ্ধ হয়নি, যা এই স্থানটিকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। গবেষকরা মনে করছেন, এই ঝিনুকগুলোর বিশেষ প্রতীকী তাৎপর্য ছিল এবং সম্ভবত সমাধিস্থ করার আগে মৃতকে একটি আচারিক 'সাজসজ্জা' বা 'ইনসেনেশন' হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এছাড়াও, প্রত্নতাত্ত্বিকরা কঙ্কালের চারপাশে ছোট ছোট পাখির হাড় খুঁজে পেয়েছেন। নরওয়ের মাটিতে এই ধরনের ভঙ্গুর জৈব উপাদান সংরক্ষিত থাকা অত্যন্ত বিরল, কারণ সাধারণত এগুলো দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই হাড়গুলো হয়তো পালকের আচ্ছাদন বা পোশাকের সজ্জামূলক অংশের অংশ ছিল। স্থানীয় ঝিনুক বালির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এই ভঙ্গুর উপাদানগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, যা গবেষকদের জন্য নতুন তথ্য উন্মোচন করেছে।
দুর্ভাগ্যবশত, সমাধির কিছু অংশ ১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই সময় একটি নিষ্কাশন খাল খননের ফলে এটি পায়ের অঞ্চল ভেদ করে গিয়েছিল, যদিও সমাধির উপরের অংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো অক্ষত ছিল। এই ঐতিহাসিক হুমকির গুরুত্ব উপলব্ধি করে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা নরওয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অধিদপ্তর (Directorate for Cultural Heritage of Norway) থেকে দ্রুত জরুরি অর্থায়ন লাভ করেন, যার ফলে সময়মতো উদ্ধারকারী খনন কাজ চালানো সম্ভব হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত হয়।
এই আবিষ্কারের সাথে সম্পর্কিত আরেকটি আগ্রহের বিষয় হলো, মাত্র দশ মিটার দূরে এর আগে অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর আরেকটি সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই দুটি সমাধির ভৌগোলিক নৈকট্য গবেষকদের মধ্যে গভীর কৌতূহল সৃষ্টি করেছে এবং তারা এই এলাকার ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।
বিজ্ঞানীরা এখন ডিএনএ বিশ্লেষণের পরিকল্পনা করছেন যাতে নির্ধারণ করা যায় যে এই দুটি সমাধির ব্যক্তিরা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন কিনা। যদি তাদের মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত হয়, তবে এটি একটি ছোট পারিবারিক কবরস্থানের অস্তিত্বের দিকে নির্দেশ করবে, যা প্রাচীন ভ্যাল খামারে জীবন ও বংশের ধারাবাহিকতাকে প্রতিফলিত করে এবং ওই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে মূল্যবান ধারণা দেবে।



