জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে একটি বিরল নাক্ষত্রিক বিন্যাস খুঁজে পেয়েছেন, যা TIC 120362137 নামে পরিচিত। এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে ঘন বা কমপ্যাক্ট '৩+১' ধরনের বহু-নাক্ষত্রিক সিস্টেম হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে 'নেচার কমিউনিকেশনস' (Nature Communications) সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি মহাজাগতিক কাঠামোর চরম মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। হাঙ্গেরির সেজেড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী তামাশ বোরকোভিটস এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। চীন, চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়ার বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত এই প্রচেষ্টা নাক্ষত্রিক ক্লাস্টারগুলোর গতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে।
TIC 120362137 সিস্টেমের স্থাপত্য বা গঠনটি বেশ চমকপ্রদ। এর কেন্দ্রে তিনটি নক্ষত্র একে অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে একটি কোর বা কেন্দ্র তৈরি করেছে, যাকে ঘিরে চতুর্থ একটি নক্ষত্র তুলনামূলক বেশি দূরত্বে আবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, ভেতরের তিনটি নক্ষত্র এতটাই কাছাকাছি যে তারা সূর্যের চারপাশে বুধ গ্রহের কক্ষপথের সমান জায়গার মধ্যে অনায়াসেই এঁটে যাবে। অন্যদিকে, বাইরের চতুর্থ নক্ষত্রটি সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহের দূরত্বের সমান সীমানার মধ্যে অবস্থান করছে। মজার ব্যাপার হলো, ভেতরের তিনটি নক্ষত্র আমাদের সূর্যের তুলনায় অনেক বেশি উত্তপ্ত এবং বিশাল, তবে বাইরের নক্ষত্রটি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অনেকটা আমাদের সূর্যের মতোই। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৯০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই সিস্টেমটির বাইরের নক্ষত্রটির কক্ষপথের সময়কাল মাত্র ১০৪৬ দিন, যা এই ধরনের '৩+১' সিস্টেমের ক্ষেত্রে একটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড।
এই সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রে একটি গ্রহণকারী বাইনারি নক্ষত্র যুগল রয়েছে যাদের আবর্তনকাল মাত্র ৩.৩ পার্থিব দিন। এই যুগলটি আবার ৫১.৩ দিন অন্তর একটি তৃতীয় নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। সাধারণত এই ধরনের সিস্টেমে চতুর্থ নক্ষত্রটি খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন, কারণ এর জন্য দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। নাসা-র টেস (TESS - Transiting Exoplanet Survey Satellite) উপগ্রহ ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই তথ্য সংগ্রহ করেছে। পরবর্তীতে অ্যারিজোনার মাউন্ট হপকিন্সে অবস্থিত ১.৫ মিটারের টিলিংহাস্ট টেলিস্কোপের 'টিলিংহাস্ট রিফ্লেক্টর এচেল স্পেকট্রোগ্রাফ' (TRES) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে এটি সমন্বয় করা হয়। প্রথমবারের মতো এই ধরনের সিস্টেমে চারটি নক্ষত্রেরই বর্ণালী চিহ্ন সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা তাদের ভর এবং গতিপথ নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে সাহায্য করেছে। স্পেকট্রোগ্রাফটি চতুর্থ নক্ষত্রের উপস্থিতিও নিশ্চিত করেছে।
গাণিতিক সিমুলেশন বা সংখ্যাসূচক মডেলিং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নক্ষত্রগুলোর এই অতি ঘন বিন্যাসের কারণে ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে ভরের আদান-প্রদান এবং শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ বা একীভূত হওয়ার ঘটনা ঘটবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৯.৩৯ বিলিয়ন বছর পর এই চারটি নক্ষত্র মিলে একটি স্থিতিশীল শ্বেত বামন (White Dwarf) যুগলে পরিণত হবে। বিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে ভেতরের প্রধান নক্ষত্রটি তার সঙ্গীর সাথে মিশে 'A' নামক একটি পিণ্ড তৈরি করবে। এর প্রায় ২৭৬ মিলিয়ন বছর পর, 'A' তৃতীয় নক্ষত্র 'B'-এর সাথে মিশে একটি বিশাল নক্ষত্র 'AB' গঠন করবে, যা শেষ পর্যন্ত শ্বেত বামনে পরিণত হবে। একইভাবে বাইরের চতুর্থ নক্ষত্রটিও শ্বেত বামন হয়ে যাবে এবং পুরো সিস্টেমটি ৪৪ দিনের কক্ষপথের একটি বাইনারি শ্বেত বামন জোড়ায় রূপান্তরিত হবে। এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত ঘন নাক্ষত্রিক বিন্যাসের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক মডেলগুলোকে সরাসরি প্রমাণ করে।
TIC 120362137 আবিষ্কারের ক্ষেত্রে টেস (TESS) ডাটা বিশ্লেষণে সাধারণ নাগরিক বিজ্ঞানীদের (Citizen Scientists) অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এটি নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে শ্রেণীবদ্ধ সিস্টেমগুলোর গুরুত্বকে পুনরায় নিশ্চিত করে। শুধুমাত্র আলোর বক্ররেখা বা 'লাইট কার্ভ' বিশ্লেষণের পরিবর্তে সরাসরি চারটি নক্ষত্রের বর্ণালী শনাক্ত করা একটি বড় পদ্ধতিগত সাফল্য। এই ধরনের সুষম এবং জটিল সিস্টেমগুলো চরম ঘনত্বের পরিবেশে নাক্ষত্রিক বিবর্তনের তত্ত্বগুলো যাচাই করার জন্য অমূল্য তথ্য সরবরাহ করে। এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে মহাকাশ বিজ্ঞানের আরও জটিল রহস্য সমাধানে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
