ব্রাজিলের পারানা রাজ্যের রিও ব্রাংকো দো সুল-এর একটি বনাঞ্চল এলাকায় Google Maps-এ দুটি অবজেক্ট খুঁজে পাওয়া গেছে। (25°09'09.9"S 49°24'28.2"W).
গুগল ম্যাপের স্যাটেলাইট চিত্রে রহস্যময় বস্তু: ব্রাজিলের জঙ্গলে নতুন এক আবিষ্কার
লেখক: Uliana S.
২০২৬ সালের শুরুর দিকে ইন্টারনেটে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত স্যাটেলাইট মানচিত্রের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে। ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গুগল ম্যাপের ছবিতে ব্রাজিলের পারানা রাজ্যের রিও ব্রাঙ্কো দো সুল এলাকার ঘন বনাঞ্চলের উপরে দুটি অদ্ভুত বস্তু দেখা যায়। এই ঘটনাটি দ্রুতই মহাকাশ উৎসাহী, সংশয়বাদী এবং বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে, যা ডিজিটাল মানচিত্রে এই ধরণের অসঙ্গতির প্রকৃতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও অনেকে তৎক্ষণাৎ একে ভিনগ্রহী যান বা ইউএফও (UFO) হিসেবে দাবি করেছেন, তবে বিশেষজ্ঞরা আরও বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করছেন, যেখানে স্যাটেলাইট ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে অপটিক্যাল ইলিউশন বা দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি হতে পারে তা তুলে ধরা হয়েছে।
নির্দিষ্টভাবে ২৫°০৯'০৯.৯"S ৪৯°২৪'২৮.২"W স্থানাঙ্কে দেখা যাওয়া এই চিত্রটিতে দুটি বস্তু স্পষ্টভাবে ঘন সবুজ বনাঞ্চলের পটভূমিতে ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে একটি বস্তু ত্রিভুজাকৃতির, যার গায়ে লালচে আভা এবং সাদা রঙের ছোঁয়া রয়েছে যা অনেকটা ডানা বা স্ট্যাবিলাইজারের মতো দেখায়। এটি গাছের উপরিভাগে ভেসে থাকার মতো মনে হচ্ছে এবং এর একটি তীক্ষ্ণ 'নাক' একপাশে নির্দেশ করছে। এর ঠিক পাশেই ডানদিকে দ্বিতীয় বস্তুটি অবস্থিত—যা গোলাকার এবং একটি গিয়ার বা খণ্ডযুক্ত ডিস্কের মতো রেডিয়াল কাঠামো বিশিষ্ট। এই বৃত্তাকার অংশটি মূলত সাদা রঙের, যার কেন্দ্রে গোলাপি আভা রয়েছে এবং এটি তার পাশের ত্রিভুজাকার বস্তুটির তুলনায় অনেক বেশি সুষম দেখায়। আশেপাশের ভূখণ্ডের তুলনায় বস্তু দুটি খুব একটা বড় নয়—মানচিত্রের স্কেল অনুযায়ী এগুলোর আকার কয়েক দশ মিটার হতে পারে, তবে সঠিক পরিমাপ নির্ভর করে স্যাটেলাইটটি কত উচ্চতা থেকে ছবি তুলেছে তার ওপর।
মজার বিষয় হলো, এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে UFO mania নামক একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এই একই স্থানাঙ্কগুলো অ্যাপল ম্যাপস (Apple Maps) এবং বিং ম্যাপস (Bing Maps)-এর মতো বিকল্প পরিষেবাগুলোতেও যাচাই করা হয়েছে, যেখানে ২০২৬ সালের জানুয়ারির আপডেট করা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে কিন্তু কোনো অদ্ভুত বস্তুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; কেবল নিরবচ্ছিন্ন বনভূমি দেখা গেছে। এই তথ্যটি তৎক্ষণাৎ প্রমাণ করে যে, এগুলো কোনো স্থায়ী কাঠামো যেমন দালান বা কৃত্রিম স্থাপনা নয়। রিও ব্রাঙ্কো দো সুল অঞ্চলটি ব্রাজিলের আটলান্টিক ফরেস্টের অংশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে পাহাড়, নদী এবং প্রচুর জীববৈচিত্র্য রয়েছে। এখানে কোনো বড় শিল্প কারখানা বা সামরিক ঘাঁটি নেই, যা এই 'রহস্যময় অতিথিদের' উপস্থিতিকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে সেই সময়ে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার খবর পাওয়া না গেলেও ইন্টারনেটে জল্পনা-কল্পনা থামেনি।
প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের ছবির পেছনে প্রকৃত কারণ কী হতে পারে? গুগল ম্যাপসের স্যাটেলাইট ছবিগুলো মূলত বিভিন্ন সময়ে কক্ষপথ থেকে তোলা অসংখ্য ছবির সমন্বয়ে তৈরি করা হয়। প্রায়শই এই ছবিগুলোতে চলমান বস্তু যেমন বিমান, ড্রোন বা এমনকি পাখিও ধরা পড়ে যায়—যা গতির কারণে এবং ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলের প্রভাবে বিকৃত হয়ে অদ্ভুত আকার ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ত্রিভুজাকার বস্তুটি উড়ন্ত বিমানের একটি বিশেষ রূপ হতে পারে; এর লালচে রঙ সূর্যের আলোর প্রতিফলন বা ছবি প্রক্রিয়াকরণের ত্রুটি হতে পারে এবং সাদা রেখাগুলো ডানার চিহ্ন হতে পারে। অন্যদিকে, গোলাকার বস্তুটি কোনো আবহাওয়া বেলুন বা বাণিজ্যিক ড্রোনের মতো কোনো উড়ন্ত যান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি বা 'আর্টিফ্যাক্ট' গুগল ম্যাপসে নতুন কিছু নয়; অতীতেও 'উড়ন্ত গাড়ি' বা 'ভুতুড়ে জাহাজ' দেখা গিয়েছিল যা মানচিত্র আপডেট করার পর অদৃশ্য হয়ে যায়।
ভূ-তথ্যবিজ্ঞান বা জিওইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, বিভিন্ন ম্যাপ পরিষেবার মধ্যে ছবি তোলার তারিখের পার্থক্য থাকে—গুগল প্রায়শই কিছুটা পুরনো ছবি ব্যবহার করে। এটি একটি বড় কারণ হতে পারে যে কেন এই বস্তুগুলো শুধুমাত্র একটি প্ল্যাটফর্মেই দেখা যাচ্ছে, যা মূলত সময়ের পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট একটি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা।
স্যাটেলাইট মানচিত্রে এই ধরণের অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা যেতে পারে। ব্রাজিলের ইউএফও বা ভিনগ্রহী যান দেখার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—যার মধ্যে ১৯৯৬ সালের বিখ্যাত ভার্জিনহা ঘটনা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সাও পাওলোতে দেখা যাওয়া সাম্প্রতিক ভিডিওগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই ঐতিহাসিক পটভূমির কারণেই এই ধরণের নতুন আবিষ্কারগুলো জনমানসে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এবং বিভিন্ন তত্ত্বের জন্ম দেয়।
তবে বৈজ্ঞানিক মহল এই বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। রাডার ডেটা বা নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের মতো অতিরিক্ত তথ্য ছাড়া শুধুমাত্র ছবির ওপর ভিত্তি করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। এই ঘটনা নিয়ে তৈরি একটি ইউটিউব ভিডিওতে বিশ্লেষকরা ছবিগুলো ফ্রেম ধরে বিশ্লেষণ করেছেন এবং ধারণা করেছেন যে, বস্তুগুলো নিকটবর্তী কুরিটিবা বিমানবন্দরের নিয়মিত বিমান চলাচলের অংশ হতে পারে, যা বিশেষ আলোক পরিস্থিতিতে এমন অদ্ভুত রূপ নিয়েছে।
যদিও এই ঘটনার কোনো নাটকীয় বা অতিপ্রাকৃত পরিণতি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, তবুও এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে সাধারণ মানুষকেও আকাশের 'গবেষক' হয়ে উঠতে সাহায্য করছে। এটি স্যাটেলাইট মানচিত্রের বিবর্তনকেও তুলে ধরে: ছবির গুণমান যত বাড়ছে, এই ধরণের 'আবিষ্কারের' সংখ্যাও তত বাড়ছে, যা বিজ্ঞান এবং যৌক্তিক চিন্তার প্রতি মানুষের আগ্রহকে উদ্দীপিত করে। গুগল এখনও এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে মানচিত্রের পরবর্তী আপডেটে হয়তো এই বস্তুগুলো মুছে যাবে এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকের একটি কৌতূহলী ডিজিটাল এপিসোড হিসেবে ইন্টারনেটের আর্কাইভে থেকে যাবে।
