অ্যাস্ট্রোবায়োলজিতে ফের্মি প্যারাডক্সের ব্যাখ্যা হিসেবে মহাসাগরীয় বিশ্বের হাইপোথিসিস

সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.

মহাসাগরীয় জগৎ ধারণাটি দেখায় যে জীবন, যদি উৎপন্ন হয়, স্থিতিশীল, কিন্তু বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। (একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক দ্বারা তৈরি চিত্র).

২০২৬ সালে মহাকাশ গবেষণা এবং ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধানে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এই তত্ত্বটি মূলত ফের্মি প্যারাডক্সের একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। এই ধারণার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো সৌরজগতের বরফাবৃত উপগ্রহগুলো, যেমন ইউরোপা, টাইটান এবং এনসেলাডাস। এই উপগ্রহগুলোর উপরিভাগে থাকা পুরু বরফের স্তরের নিচে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এই হাইপোথিসিসের প্রবক্তাদের মতে, এই ধরনের জগতগুলোর ভূ-ভৌতিক বিচ্ছিন্নতাই সম্ভবত উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতার অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। কারণ, যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণ এই বরফের নিচের মহাসাগরে বিবর্তিতও হয়, তবে তাদের পক্ষে মহাকাশ যোগাযোগ বা দৃশ্যমান প্রযুক্তি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

১৯৫০ সালে পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মি একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা আজ 'ফের্মি প্যারাডক্স' নামে পরিচিত। মহাবিশ্বে কোটি কোটি নক্ষত্র এবং গ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এখনো কোনো উন্নত ভিনগ্রহী সভ্যতার প্রমাণ পাইনি—এটাই ছিল তাঁর জিজ্ঞাসার মূল বিষয়। মহাসাগরীয় বিশ্বের হাইপোথিসিস অনুযায়ী, প্রাণ যদি কোথাও সৃষ্টি হয়েও থাকে, তবে তা হয়তো অত্যন্ত স্থিতিশীল কিন্তু বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রয়ে গেছে। এই জগতগুলোতে জোয়ার-ভাটার তাপের (tidal heat) কারণে পানি তরল অবস্থায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, 'জুনো' মিশনের তথ্য অনুসারে, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার বরফ স্তরের গড় পুরুত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার (১৮ মাইল)। এই বিশাল বরফের স্তর উপরিভাগের ক্ষতিকর বিকিরণ এবং মহাজাগতিক হুমকি থেকে অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে রক্ষা করে।

ইউরোপা, টাইটান এবং এনসেলাডাস বর্তমানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির (ESA) 'ক্যাসিনি' মিশন এনসেলাডাস সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। এই মিশনটি এনসেলাডাসের দক্ষিণ মেরু অঞ্চল থেকে জলীয় বাষ্পের ফোয়ারা নির্গত হতে দেখেছে, যাতে জৈব অণু এবং হাইড্রোজেনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এটি মূলত হাইড্রোথার্মাল কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়, যা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য সহায়ক হতে পারে। প্রখ্যাত গ্রহ বিজ্ঞানী অ্যালান স্টার্ন উল্লেখ করেছেন যে, বাহ্যিক বিপদ থেকে সুরক্ষিত থাকার কারণে এই মহাসাগরীয় জগতগুলো পৃথিবীর মতো গ্রহের তুলনায় প্রাণের জন্য অনেক বেশি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রদান করতে পারে।

নাসা (NASA) বর্তমানে এই রহস্যময় জগতগুলো নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর ফ্যালকন হেভি রকেটের মাধ্যমে নাসার 'ইউরোপা ক্লিপার' মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মহাকর্ষীয় শক্তি ব্যবহার করে গতি বৃদ্ধি করবে এবং ২০৩০ সালের এপ্রিলে ইউরোপায় পৌঁছাবে। প্রায় ৬০৬৫ কেজি ওজনের এই প্রোবটি ইউরোপার বরফের নিচের মহাসাগরে প্রাণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সিও এনসেলাডাসে একটি ভবিষ্যৎ মিশনের পরিকল্পনা করছে, যা অ্যাস্ট্রোবায়োলজির ক্ষেত্রে বরফাবৃত উপগ্রহগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেই ফুটিয়ে তোলে।

এই বিচ্ছিন্নতাই যেমন ফের্মি প্যারাডক্সের সমাধান দেয়, তেমনি এটি সভ্যতার বিকাশে একটি বড় বাধা হিসেবেও কাজ করে। যদি এই পরিবেশে বুদ্ধিমান প্রাণের বিবর্তন ঘটেও থাকে, তবে তারা সম্ভবত সাধারণ অণুজীব বা জটিল সামুদ্রিক প্রাণীর স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাদের পক্ষে আন্তঃনাক্ষত্রিক যোগাযোগ বা রেডিও সংকেত পাঠানো সম্ভব নয়। এটিই মহাবিশ্বের 'মহা নীরবতা' বা 'গ্রেট সাইলেন্স'-এর কারণ হতে পারে। আমরা হয়তো রেডিও সংকেত খুঁজছি, কিন্তু উন্নত সভ্যতাগুলো হয়তো ভূতাত্ত্বিকভাবে তাদের বরফের নিচে আটকা পড়ে আছে। সুতরাং, মহাসাগরীয় বিশ্বের হাইপোথিসিস আমাদের চিন্তাধারায় এক আমূল পরিবর্তন আনে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, দৃশ্যমান ভিনগ্রহী সভ্যতার অভাব মানেই প্রাণের অনুপস্থিতি নয়, বরং তারা হয়তো আমাদের বর্তমান শনাক্তকরণ পদ্ধতির আড়ালে লুকিয়ে আছে। ইউরোপা ক্লিপারের মতো মিশনগুলো তাই মানবজাতির মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Semana.com Últimas Noticias de Colombia y el Mundo

  • Gizmodo en Español

  • Wikipedia

  • Twitter

  • Eureka

  • National Geographic

  • Gadgets360

  • Identidad Correntina

  • Europlanet Science Congress (EPSC) and Division for Planetary Sciences (DPS) joint meeting

  • Astrobiology Web

  • YouTube

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।