গ্রেট বারিয়ার রিফে একটি নতুন রোবট ডাগংগুলিকে সাহায্য করছে
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে বিশালাকার প্রবালের সন্ধান: জলবায়ু পরিবর্তনের মাঝে আশার এক নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বারবার প্রবাল ব্লিচিং বা সাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনার মাঝে এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক খবর সামনে এসেছে। 'গ্রেট রিফ সেন্সাস' (GRC) প্রকল্পের আওতায় একদল নাগরিক গবেষক 'পাভোনা ক্লাভাস' (Pavona clavus) প্রজাতির একটি বিশালাকার প্রবাল কলোনি আবিষ্কার করেছেন। প্রাথমিক তথ্য ও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি এই অঞ্চলে এ পর্যন্ত নথিভুক্ত হওয়া বৃহত্তম প্রবাল কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।
এই বিস্ময়কর সামুদ্রিক কাঠামোটি কুইন্সল্যান্ডের কেয়ার্নস উপকূলের কাছে অবস্থিত। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পরিচালিত ম্যাপিং এবং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই প্রবাল কলোনির বিশালতা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই কাঠামোর বিস্তৃতি নিম্নরূপ:
- দৈর্ঘ্য — প্রায় ১১১ মিটার
- আয়তন — প্রায় ৪০০০ বর্গমিটার
এই অসাধারণ সামুদ্রিক গঠনটি প্রথম নজরে আনেন জেন পোপ নামে একজন স্বেচ্ছাসেবক। পরবর্তীতে 'সিটিজেনস অফ দ্য রিফ' নামক সংস্থার সোফি কালকোস্কি-পোপ এই প্রবাল কলোনিটি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও জরিপ পরিচালনা করেন।
প্রবালটির সঠিক আয়তন এবং গঠনশৈলী নির্ধারণের জন্য গবেষকরা 'ফটোগ্রামমেট্রি' নামক একটি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এই পদ্ধতিতে পানির উপরিভাগ থেকে সংগৃহীত অসংখ্য স্থিরচিত্রের সমন্বয়ে একটি নিখুঁত থ্রিডি (3D) মডেল তৈরি করা হয়, যা বিজ্ঞানীদের নির্ভুল তথ্য প্রদান করে।
বর্তমানে সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে 'পাভোনা ক্লাভাস' প্রজাতির এত বড় এবং সুস্থ কলোনি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ভয়াবহ ব্লিচিং ইভেন্ট সহ সাম্প্রতিক বছরগুলোর তাপপ্রবাহ এই অঞ্চলের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এই বিশাল কাঠামোটি কি একটি একক জীব, নাকি একাধিক জীবের সমষ্টি—তা নিশ্চিত করার জন্য বর্তমানে জেনেটিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনই এই স্থানটিকে একটি সম্ভাব্য 'স্থিতিস্থাপকতার কেন্দ্র' বা 'রেজিলিয়েন্স হাব' হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
গবেষকরা খতিয়ে দেখছেন যে, স্থানীয় জোয়ার-ভাটার স্রোত এখানে কোনো বিশেষ ভূমিকা পালন করছে কি না। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্রোতগুলো প্রবালটির চারপাশে একটি স্থিতিশীল তাপমাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা একে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত 'গ্রেট রিফ সেন্সাস' (GRC) প্রকল্পটি একটি বিশেষ হাইব্রিড মডেলে কাজ করে, যা আধুনিক বিজ্ঞান ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের এক অনন্য উদাহরণ। এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো:
- স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা সংগৃহীত উচ্চমানের ছবি
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ
- তথ্যের নির্ভুলতা ও ব্যাখ্যার হার ৯৭% থেকে ৯৯% পর্যন্ত
২০২১ সাল থেকে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ মেরিন পার্ক অথরিটি এই জিআরসি (GRC) প্রকল্পের ডেটা নিয়মিত ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে 'ক্রাউন-অফ-থর্নস স্টারফিশ' (COTS) বা কাঁটাযুক্ত সামুদ্রিক তারা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে এই তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এই তারাগুলো প্রবাল ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ।
অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূল বরাবর প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। বর্তমানে এই সুবিশাল এলাকাটি প্রবালের ক্ষয় এবং প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধারের এক নিরন্তর যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য অনুসন্ধান করছেন।
এর আগে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের গভীর সমুদ্রে প্রায় ৩০০ বছর বয়সী একটি 'পাভোনা ক্লাভাস' কলোনি আবিষ্কৃত হয়েছিল। সমুদ্রের গভীরতা এবং পলিপের স্থিতিশীল মাইক্রোবায়োমকে সেই প্রবালটির দীর্ঘ সময় টিকে থাকার প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় 'কোজি' যখন এই অঞ্চলে আঘাত হানে, তখন এই বিশাল জীবন্ত কাঠামোর অস্তিত্বের খবরটি বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে আসে। এটি কেবল একটি বিশাল আকৃতির প্রবাল নয়, বরং এটি প্রতিকূলতার মাঝে জীবনের জয়গানের প্রতীক।
এটি কেবল একটি বিশাল আকার নয়, এটি হলো সমুদ্রের গভীরে স্পন্দিত এক নতুন জীবনের গল্প। এই আবিষ্কারটি আমাদের গ্রহের অস্তিত্বের লড়াইয়ে এক শান্ত কিন্তু শক্তিশালী স্মৃতির সুর যোগ করেছে।
যখন সমুদ্রের উপরিভাগ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জলবায়ু সংকটের মুখে পড়ছে, তখন তার গভীরে এমন কিছু কাঠামো নিরবে বেড়ে উঠছে যাদের বয়স ঋতু দিয়ে নয়, বরং দশক এবং শতাব্দী দিয়ে গণনা করা হয়। জীবন এখানে কোনো চিৎকার করে না, বরং নিঃশব্দে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখে আমাদের আগামীর স্বপ্ন দেখায়।
উৎসসমূহ
The Guardian
KVIA
CNN Wire
theguardian.com
Queensland Museum



