দীর্ঘায়ুর রহস্য: গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়ার এক অনন্য প্যারাডক্স

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

গ্রিনল্যান্ড শার্ক: ৫০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে এমন শার্ক | OceanXplorers | National Geographic UK

গ্রিনল্যান্ড পোলার হাঙ্গর পৃথিবীর দীর্ঘতমজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই প্রাণীর এক বিস্ময়কর জৈবিক বৈশিষ্ট্য উন্মোচিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই হাঙ্গরগুলো ২৫০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম, যা প্রকৃতি জগতের এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।

আন্তর্জাতিক একদল গবেষক লক্ষ্য করেছেন যে, এই হাঙ্গরগুলোর হৃদপিণ্ড—এমনকি ১০০ থেকে ১৫০ বছর বয়সী 'তরুণ' হাঙ্গরদের ক্ষেত্রেও—এমন কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করে যা সাধারণত অন্যান্য প্রজাতির বার্ধক্যজনিত গুরুতর রোগের সাথে সম্পর্কিত। এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বার্ধক্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

হৃদপিণ্ডের কলার অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে করা বিশ্লেষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে যা সাধারণত অসুস্থতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়:

  • মায়োকার্ডিয়াল ফাইব্রোসিস বা হৃদপিণ্ডের পেশিতে ক্ষতচিহ্নের ব্যাপক উপস্থিতি।
  • লিপোফুসিন নামক 'বার্ধক্য রঞ্জক'-এর উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় যা কোষের বার্ধক্য নির্দেশ করে।
  • নাইট্রোটাইরোসিন নামক মার্কারের উপস্থিতি, যা দীর্ঘস্থায়ী অক্সিডেটিভ এবং প্রদাহজনিত চাপের প্রমাণ দেয়।

মানুষ বা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের টিস্যুর অবস্থা সাধারণত হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার বা হার্ট ফেইলিউরের উচ্চ ঝুঁকি নির্দেশ করে। তবে গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিস্ময়কর। তাদের হৃদপিণ্ড কোনো দৃশ্যমান কার্যক্ষমতা হ্রাস ছাড়াই কাজ চালিয়ে যায় এবং তাদের আয়ু অত্যন্ত দীর্ঘ হয়।

পিসার স্কুওলা নরমাল সুপিরিয়র-এর অধ্যাপক আলেসান্দ্রো সেলেরিনো স্বীকার করেছেন যে, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে প্রথমবার এই দৃশ্য দেখে গবেষকরা অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। তারা প্রথমে ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো কারিগরি ত্রুটি বা স্লাইড তৈরির সময় ঘটে যাওয়া কোনো ভুল।

তবে বারবার পরীক্ষা এবং গভীর বিশ্লেষণের পর ফলাফলটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এটি কোনো পরিমাপের ত্রুটি নয়, বরং এই প্রাণীর এক অনন্য এবং স্বাভাবিক জৈবিক বৈশিষ্ট্য যা তাদের দীর্ঘ জীবনের রহস্যের সাথে যুক্ত।

প্রেক্ষাপট এবং গুরুত্ব বোঝার জন্য গবেষকরা এই তথ্যগুলোকে অন্যান্য প্রজাতির সাথে তুলনা করেছেন। তারা স্বল্পজীবী এবং দীর্ঘজীবী প্রাণীদের মধ্যে পার্থক্যের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন:

  • ব্ল্যাকমাউথ ক্যাটশার্ক, যার স্বাভাবিক জীবনচক্র মাত্র ১১ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
  • টারকোয়েজ কিলিফিশ, যা বিশ্বের অন্যতম স্বল্পজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে পরিচিত এবং মাত্র কয়েক মাস বাঁচে।

তুলনামূলক এই গবেষণার ফলাফল ছিল বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ এবং চমকপ্রদ। দেখা গেছে যে, স্বল্পজীবী প্রজাতিগুলোর মধ্যে ফাইব্রোসিস বা হৃদপিণ্ডের ক্ষতচিহ্ন ছিল নগণ্য বা একেবারেই অনুপস্থিত, যা গবেষকদের অবাক করেছে।

অন্যদিকে, নাইট্রোটাইরোসিন নামক ক্ষতিকারক উপাদানটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাওয়া গেছে গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর এবং কিলিফিশ উভয়ের মধ্যেই। কিন্তু পার্থক্যের জায়গাটি হলো, শুধুমাত্র হাঙ্গরই কোনো শারীরিক বা কার্যক্ষমতা বিপর্যয় ছাড়াই এই অবস্থাকে সহ্য করার ক্ষমতা দেখিয়েছে।

এই আবিষ্কারটি বার্ধক্যের একটি নতুন মডেল বা প্যারাডক্স তৈরি করেছে। সাধারণ বার্ধক্য মডেলটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধারায় চলে: প্রথমে ক্ষতি হয়, তারপর সেই ক্ষতির সঞ্চয় ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সিস্টেমের ব্যর্থতা দেখা দেয়।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন কৌশল প্রদর্শন করে। তাদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি হলো: ক্ষতি বা ইনজুরি গ্রহণ করা, তারপর তার প্রতি সহনশীলতা তৈরি করা, এবং কাঠামোগত অভিযোজনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব অর্জন করা।

মানুষের ক্ষেত্রে ফাইব্রোসিস বা টিস্যুর ক্ষত সাধারণত অগোছালো এবং ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির হয়। কিন্তু হাঙ্গরের ক্ষেত্রে এই ফাইব্রোসিস অত্যন্ত ধীর, সুশৃঙ্খল এবং তাদের টিস্যুর কাঠামোর সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে নেওয়া। এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং সিস্টেমের এক নতুন ধরনের বিন্যাস।

অক্সিডেটিভ চাপের প্রতি এই অসাধারণ সহনশীলতা দীর্ঘায়ুর এক নতুন পথ দেখায়। ক্ষতি পুরোপুরি প্রতিরোধ করার বৃথা চেষ্টা করার পরিবর্তে, হাঙ্গরের শরীর একে মেনে নেয় কিন্তু এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবগুলোকে কার্যকরভাবে আটকে দেয়।

উত্তর আটলান্টিকের অত্যন্ত শীতল জলরাশি, হাঙ্গরের ধীর বিপাক প্রক্রিয়া এবং শারীরিক উত্তেজনার অভাব তাদের শরীরকে এক বিশেষ সুরক্ষা দেয়। এই পরিবেশগত প্রভাবের কারণে তাদের শরীর প্রদাহজনিত কোনো 'আতঙ্ক' বা প্যানিক মোডে প্রবেশ করে না।

আধুনিক জিনোম গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাদের ডিএনএ মেরামতের ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং শক্তিশালী। তাদের মধ্যে 'জাম্পিং জিন' বা মোবাইল এলিমেন্টের উচ্চ সক্রিয়তা এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে এক অনন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা লক্ষ্য করা গেছে। তাদের শরীরে ক্ষতিগুলো অদৃশ্য হয় না, বরং সেগুলো ক্রমাগত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের মধ্যে থাকে।

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গবেষক জোয়াও পেড্রো ডি মাগালহায়েস এই গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই কাজটি বার্ধক্যের আণবিক ভিত্তি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে প্রমিত মডেল প্রাণীদের বাইরেও প্রকৃতির বিশাল ভাণ্ডারে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি বিখ্যাত 'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' (Scientific Reports) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের জিনোম সংক্রান্ত অন্যান্য সমান্তরাল কাজগুলোও তাদের অত্যন্ত ধীর জীবনচক্র এবং প্রায় ১৫০ বছর বয়সে গিয়ে যৌন পরিপক্কতা লাভের বিস্ময়কর তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।

গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর আমাদের এই গ্রহের এক জীবন্ত পাঠশালা। এটি আমাদের শেখায় যে জীবন বার্ধক্যের ছাপ বহন করেও অটুট এবং শক্তিশালী থাকতে পারে। এটি কেবল একটি জৈবিক শিক্ষা নয়, বরং প্রকৃতির এক গভীর রূপক যা আমাদের সহনশীলতার গুরুত্ব বোঝায়।

মহাসাগরের গভীরতা, প্রচণ্ড চাপ এবং হিমাঙ্কিত শীতলতা এই প্রাণীকে ধ্বংস করে না, বরং তাকে আরও বেশি স্থিতিস্থাপক এবং দীর্ঘজীবী করে তোলে। এটি প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এক অনন্য উদাহরণ।

তাদের হৃদপিণ্ড দেখতে একজন বৃদ্ধের মতো হলেও তাদের জীবন যেন অনন্তকালের এক শান্ত প্রতিধ্বনি। এটিই গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের প্যারাডক্স—যা আমাদের শেখায় যে ক্ষত বা বার্ধক্য মানেই শেষ নয়, বরং এটি অভিযোজনের এক নতুন রূপ হতে পারে।

11 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • New Scientist

  • Research Explorer The University of Manchester

  • What the World's Longest-Lived Animals Can Teach Us About Aging - Time Magazine

  • Greenland Sharks Can Live for 400 Years. Scientists Are Using DNA to Unravel Their Longevity Secrets - Smithsonian Magazine

  • What is behind ageing's causal wheel? - University of Birmingham

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।