২০২৬ সালের ৬ মার্চ, শুক্রবার, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুন 'জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল ২০২৬' উন্মোচন করেছে। সাত পৃষ্ঠার এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে এমন সিস্টেম হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেগুলোর জন্য বিশেষ 'সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা' প্রয়োজন। এই কৌশলটি প্রণয়নে মূল সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেছে অফিস অফ দ্য ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টর (ONCD), যা সাইবার নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে।
জাতীয় নিরাপত্তার এই মূল নথিতে বিকেন্দ্রীভূত আর্থিক অবকাঠামোকে অন্তর্ভুক্ত করা ফেডারেল দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। এটি মূলত দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করার একটি প্রয়াস। ২০২৩ সালের আগের কৌশলের সাথে এর স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, যেখানে এই প্রযুক্তিগুলোর কোনো উল্লেখই ছিল না। এই পদক্ষেপটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের 'ক্রিপ্টো রাজধানী' হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষিত লক্ষ্যের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই দলিলে আমেরিকার সাইবার প্রতিরক্ষা মজবুত করার জন্য ছয়টি মূল স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সাথে নিবিড় সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত।
কৌশলের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেডারেল নেটওয়ার্কগুলোর আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। এর আওতায় পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি প্রয়োগ, জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার গ্রহণ এবং ক্লাউড প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো রক্ষা এবং বিদেশী প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। পঞ্চম স্তম্ভের অধীনে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সাথে একই সারিতে স্থান দেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে মার্কিন প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা।
শিল্প খাতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণে ফেডারেল অর্থায়নের একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন। তবে গ্যালাক্সি ডিজিটাল-এর বিশ্লেষক অ্যালেক্স থর্নের মতো বিশেষজ্ঞরা একটি বিশেষ দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, 'অপরাধমূলক অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং আর্থিক লেনদেনের গোপন পথ বন্ধ করা' সংক্রান্ত ভাষাটি সরকারি সংস্থাগুলো মিক্সার এবং নির্দিষ্ট কিছু গোপনীয়তা প্রোটোকলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যবহার করতে পারে। এটি এক ধরনের নিয়ন্ত্রক অস্পষ্টতা তৈরি করে, কারণ সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই ঘোষণাটি বাজার সংশ্লিষ্টদের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি স্পষ্টতা প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।
এই কৌশলটি প্রকাশের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যা ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সাইবার জালিয়াতির সাথে জড়িত আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এই আদেশটি স্ট্র্যাটেজিক বিটকয়েন রিজার্ভ (SBR) এবং ইউএস ডিজিটাল অ্যাসেট ফান্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত, যা ২০২৫ সালের মার্চের একটি আদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং মূলত বাজেয়াপ্ত করা সম্পদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ফেডারেল সরকারের কাছে বর্তমানে প্রায় ৩২৮,৩৭২টি বিটকয়েন (BTC) রয়েছে, যা দেশটিকে বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি বিটকয়েন মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। SBR-এর নীতি অনুযায়ী, সরকার এই বিটকয়েনগুলো বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহের জন্য বাজেট-নিরপেক্ষ কৌশল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
পরিশেষে, এই কৌশলটি উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে নজিরবিহীন সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বাজারের অংশীদাররা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং কংগ্রেসের কাছ থেকে আরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে বৈধ ডিজিটাল সম্পদ উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হবে না, বরং বাজার কার্যক্রম এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল কাঠামো বজায় থাকবে। এই কৌশলটি আমেরিকার সাইবার নিরাপত্তার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।



