ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে বিটকয়েনের দৃঢ়তা: সোনা ও শেয়ার বাজারকে ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায়
সম্পাদনা করেছেন: Yuliya Shumai
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ থেকে ইরান অভিমুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে প্রথাগত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সম্পদগুলো চাপের মুখে ছিল, সেখানে বিটকয়েন তার শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। ১৩ মার্চ, ২০২৬ নাগাদ বিটকয়েনের মূল্য প্রায় ৮% বৃদ্ধি পায়, যা প্রচলিত 'সেফ হ্যাভেন' সম্পদগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী আচরণ। একই সময়ে সোনার দাম প্রায় ৩% হ্রাস পেয়েছে এবং রূপার দাম ১০% এর বেশি কমে ৯০ ডলারের ওপর থেকে প্রায় ৮২ ডলারে নেমে এসেছে।
বিনিয়োগকারীদের এই পুঁজি স্থানান্তর ২০২৪ সালে বিটকয়েন-ইটিএফ (ETF) চালুর পর থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সোনা থেকে বিটকয়েনের দিকে এই ঝোঁক ছিল চোখে পড়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ, ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এসপিডিআর গোল্ড শেয়ারস (GLD) তাদের সম্পদের প্রায় ২.৭% হারিয়েছে। যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ সংঘাত শুরুর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিটকয়েন বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছিল এবং প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পজিশন লিকুইডেশন বা অবলুপ্তির ফলে দাম সাময়িকভাবে ৬৩,০০০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। তবে মার্কিন স্পট বিটকয়েন ইটিএফ-এ বিনিয়োগের প্রবাহ অব্যাহত থাকায় এই পুনরুদ্ধার ছিল অত্যন্ত দ্রুত। ১০ মার্চ, ২০২৬-এ নিট ২৫১ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসে, যার মধ্যে ব্ল্যাকরক আইবিআইটি (BlackRock IBIT) একাই ১৮৬ মিলিয়ন ডলার আকর্ষণ করে।
ম্যাক্রো-ইকোনমিক বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই বিটকয়েনের এই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্মকাণ্ডের ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় তেলের দাম ২০% বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়। এর ফলে মার্কিন শেয়ার বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়, যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500) এবং নাসডাক কম্পোজিট (Nasdaq Composite) ১% থেকে ২% পর্যন্ত হ্রাস পায়। ক্রিপ্টোকুয়ান্ট (CryptoQuant)-এর বিশ্লেষকদের মতে, তাদের 'বুল স্কোর' ৩০-এ উন্নীত হয়েছে, যা বাজারকে 'চরম বিয়ারিশ' পর্যায় থেকে বের করে আনলেও এটি এখনও একটি 'রিলিফ র্যালি' হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদী 'বুল মার্কেট' হিসেবে নয়।
জেপি মর্গান (JPMorgan)-এর মতে, সোনার তুলনায় বিটকয়েনের অস্থিরতা বা ভোলাটিলিটি কমে আসা এর প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্কতারই বহিঃপ্রকাশ। ব্যাংকের বিশ্লেষক নিকোলাওস পানিগিরতজোগ্লু (Nikolaos Panigirtzoglou) ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছিলেন যে, সোনা ও বিটকয়েনের অস্থিরতার অনুপাত কমে আসা সম্পদটির স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। জেপি মর্গান বিটকয়েনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা ২৬৬,০০০ ডলারে অপরিবর্তিত রেখেছে। ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময়ের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বিটকয়েনের জন্য ৭২,০০০ থেকে ৭৪,০০০ ডলারের মধ্যে একটি শক্তিশালী রেজিস্ট্যান্স জোন তৈরি হয়েছে, যেখানে সাপোর্ট লেভেল রয়েছে ৭০,৫০০ থেকে ৭১,০০০ ডলারের মধ্যে। উল্লেখ্য যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'এপিক ফিউরি' (Epic Fury) এবং ইসরায়েলের 'রোরিং লায়ন' (Roaring Lion) অপারেশনগুলো ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল।
স্যান্টিমেন্ট (Santiment)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিটকয়েন এখন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক থেকে বিচ্ছিন্ন বা 'ডিকাপল' হতে শুরু করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, বিটকয়েন কোনো নির্দিষ্ট দেশের অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল না থেকে একটি স্বাধীন বৈশ্বিক সম্পদ হিসেবে শক্তি প্রদর্শন করছে। মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় যখন শেয়ার বাজারের পতন ঘটছে, তখন বিটকয়েনের এই দৃঢ়তা একে একটি তরল ম্যাক্রো-অ্যাসেট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে বিটকয়েন বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে একটি অপরিহার্য এবং নির্ভরযোগ্য সম্পদ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করবে।
3 দৃশ্য
উৎসসমূহ
CryptoSlate
Bitcoin Price Reclaims $73,000, Outperforming Gold And Stocks
Bitcoin ETFs Draw Inflows as Gold Funds See Outflows Amid Iran War
Bitcoin Bull Score Surges To 30, Exits 'Extra Bearish' Zone
Hackers join U.S. and Israel's fight with Iran
With Bitcoin's surge over $72k it now outperforms gold and stocks since Iran strikes, but one brutal sell wall is looming - CryptoSlate
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



