চীন সরকার যুক্তরাজ্য এবং কানাডার সাধারণ পাসপোর্টধারী নাগরিকদের জন্য তাদের একতরফা ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকারের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিয়েছে। এই নতুন নীতিমালাটি ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। এটি মূলত পর্যটন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করার মতো সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যার সময়সীমা সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত নির্ধারিত করা হয়েছে।
বেইজিংয়ের গৃহীত এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্রিটিশ এবং কানাডিয়ান নাগরিকরা এখন থেকে কোনো পূর্ববর্তী ভিসা ছাড়াই চীনে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে, তাদের অবস্থানের মোট সময়কাল ৩০ দিনের বেশি হতে পারবে না। এই বিশেষ সুবিধার আওতায় পর্যটন ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়িক আলোচনা, সেমিনার এবং পারিবারিক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা দুই দেশের নাগরিকদের জন্য চীন ভ্রমণকে আরও সহজতর করবে।
এই নতুন ব্যবস্থার ফলে ভ্রমণকারীদের জন্য তাদের সংক্ষিপ্ত সফরের পরিকল্পনা করা অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে। এটি প্রশাসনিক জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে দেবে এবং দীর্ঘ নথিপত্র তৈরির ঝামেলা ও অতিরিক্ত কনস্যুলার ফি প্রদানের প্রয়োজনীয়তা দূর করবে। এর ফলে পর্যটকরা অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং কম সময়ে চীন ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন।
ভিসা-মুক্ত এই সুবিধার মেয়াদ বৃদ্ধি মূলত বেইজিং, লন্ডন এবং অটোয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার একটি ইতিবাচক ফলাফল। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একইভাবে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে কানাডিয়ান নাগরিকদেরও এই একতরফা ভিসা সুবিধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ভিসা শিথিলকরণ প্রক্রিয়াটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধের কারণে এই দেশগুলোর মধ্যে যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, এই পদক্ষেপটি সেই দূরত্ব কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য ও কানাডার নাগরিকদের জন্য এই সুবিধা প্রদান মূলত চীনের সামগ্রিক ভিসা উদারীকরণ নীতিরই একটি অংশ। বর্তমানে চীন বিশ্বের বেশ কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য ৩০ দিন পর্যন্ত ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক ভিসা অব্যাহতি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রানজিট সুবিধার ক্ষেত্রেও চীন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিশ্বের ৫৪টি দেশের নাগরিকরা এখন চীনের নির্দিষ্ট শহরগুলোর মাধ্যমে তৃতীয় কোনো গন্তব্যে যাওয়ার সময় ২৪০ ঘণ্টা বা ১০ দিন পর্যন্ত ট্রানজিট ভিসা-মুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এই পদক্ষেপটি এশিয়া, ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে একটি প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে চীনের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে বেইজিংয়ের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাজ্য ও কানাডার ট্যুর অপারেটররা এখন থেকে ভিসার জটিলতা ছাড়াই আরও নমনীয়ভাবে বিভিন্ন ট্যুর প্যাকেজ এবং এশীয় অঞ্চলের সমন্বিত ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবে। এটি পর্যটন সংস্থাগুলোকে তাদের গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী এবং সময়োপযোগী সেবা প্রদানের সুযোগ করে দেবে।
ব্যবসায়িক মহলের জন্য এই ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এর ফলে স্বল্প সময়ের নোটিশে ব্যবসায়িক বৈঠক, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, বাণিজ্য মেলা বা শিল্প কারখানা পরিদর্শনের কাজগুলো অনেক সহজ হবে। বিশেষ করে মহামারীর পরবর্তী সময়ে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে চীনের বর্তমান প্রচেষ্টার সাথে এই সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত এই ভিসা-মুক্ত সুবিধার নিশ্চয়তা ভ্রমণ এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছে। এটি লন্ডন ও অটোয়ার কোম্পানিগুলোর জন্য চীনা বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করার এবং উভয় দেশের মধ্যে পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত উৎসাহিত করার একটি সুবর্ণ সুযোগ।
পরিশেষে, বেইজিংয়ের এই নমনীয় ভিসা নীতি তাদের 'সফট পাওয়ার' এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে চীন বিশ্ববাসীর কাছে তাদের আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির সদিচ্ছা প্রদর্শন করছে। এই পদক্ষেপটি দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।




