ওমান হলো বৈচিত্র্য এবং অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। এখানে আরব সাগরের শুভ্র সৈকতের পাশেই দেখা মেলে মরুভূমির বিশাল বালিয়াড়ির, আর আধুনিক শহরের সাথে মিলেমিশে আছে প্রাচীন দুর্গগুলো; আবার শীতল উচ্চভূমি উষ্ণ সমভূমি থেকে একদমই আলাদা। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই প্রতি বসন্তে এক আসল অলৌকিক ঘটনা ঘটে: আল-জাবাল-আল-আখদার (সবুজ পাহাড়) পর্বতমালায় অবস্থিত উচ্চভূমির সাইক মালভূমি দামাস্ক গোলাপের হালকা গোলাপি চাদরে ঢেকে যায়। তাদের মিষ্টি এবং তীব্র সুবাস বাতাসকে পূর্ণ করে তোলে, যা এই অঞ্চলটিকে দেশের অন্যতম কাব্যিক এবং স্মরণীয় স্থানে পরিণত করে।
এই সময়টি বসন্তকালীন গোলাপের মৌসুম (Rose Season) হিসেবে পরিচিত। ২০২৬ সালে এটি ৩০ মার্চ শুরু হয়েছে এবং আনুমানিক মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। মালভূমি সাইক এবং এর আশেপাশের গ্রাম যেমন— আল-আইন, আল-আকর এবং আল-শুরাইজাতে এই ফুলের শোভা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এখানেই বিখ্যাত ধাপযুক্ত বাগানগুলো অবস্থিত, যেখানে হাজার হাজার গোলাপের ঝোপ চাষ করা হয়।
শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য
স্থানীয় কৃষকরা ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই ফুল সংগ্রহ করেন, যতক্ষণ না পাপড়িগুলো ভোরের শিশিরে সিক্ত থাকে। এই সময়ে এসেনশিয়াল অয়েল বা সুগন্ধি তেলের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। ফুলগুলো হাতে সংগ্রহ করা হয় — এটি একটি প্রাচীন পদ্ধতি যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসছে। সংগ্রহের পরপরই পাপড়িগুলো ঐতিহ্যবাহী ছোট ছোট পাতন কারখানায় নিয়ে আসা হয়, যেগুলোকে 'আল-দেহজান' বা 'আল-দুহজান' বলা হয়।
সেখানে 'আল-বুরমা' নামক বড় তামার পাত্রে গোলাপগুলোকে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে জ্বাল দেওয়া হয়। এর ফলে তৈরি হয় খাঁটি ও সুগন্ধি ওমানি গোলাপজল, যা সুগন্ধি তৈরিতে এবং স্থানীয় রান্নায় অত্যন্ত মূল্যবান। পাপড়ির একটি অংশ গোলাপের তেল, চা, মোরব্বা এবং প্রসাধন সামগ্রী তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।
প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
আল-জাবাল-আল-আখদার ওমানের অন্যতম সবুজ অঞ্চল। এখানকার অনন্য জলবায়ু এবং প্রাচীন সেচ ব্যবস্থা ফালাজ-এর (ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট) কারণে সারা বছর ধরে শুধু গোলাপই নয়, ডালিম, এপ্রিকট, পিচ, আপেল, নাশপাতি, ডুমুর, আখরোট এবং কাঠবাদামও চাষ করা হয়। গোলাপের মৌসুম অন্যান্য ফলের গাছের পুষ্পমঞ্জুরির সময়ের সাথে মিলে যায়, যা এই পার্বত্য অঞ্চলের দৃশ্যপটকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
২০২৪ সালে এই অঞ্চলে উৎপাদিত গোলাপ পণ্যের মূল্য ছিল প্রায় ২,০০,০০০ ওমানি রিয়াল এবং গোলাপজলের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮,০০০ লিটার। এই সংখ্যাগুলো ক্রমাগত বাড়ছে এবং এই মৌসুমটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফুল সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াকরণ থেকে প্রাপ্ত আয় সরাসরি কৃষক ও কারিগরদের কাছে যায়, যা পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পাহাড়ে গোলাপের মৌসুম যেভাবে কাটে
এই সময়ে গ্রামগুলোতে ফুল সংগ্রহের ভোরবেলা থেকে পাতন প্রক্রিয়া পর্যন্ত পুরো চক্রটি দেখা যায়। অনেক স্থানীয় বাসিন্দা পর্যটকদের জন্য তাদের ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্রগুলো খুলে দেন এবং ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াটি দেখান। ধাপযুক্ত বাগানগুলোতে হাঁটার সময় হাজার হাজার প্রস্ফুটিত গোলাপের ঝোপ দেখা যায় এবং পাহাড়ের চূড়া ও গভীর গিরিখাতের প্যানোরামিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এই সপ্তাহগুলোতে পাহাড়ের পরিবেশ থাকে অত্যন্ত শান্ত এবং সুগন্ধি — শীতল বাতাস, ভোরের কুয়াশা এবং গোলাপের তীব্র ঘ্রাণ এমন এক অনুভূতি তৈরি করে যেন সময় এখানে ধীর হয়ে গেছে।
গোলাপের মৌসুম কেবল একটি কৃষি উৎসব নয়, বরং এটি ওমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি প্রমাণ করে যে, কীভাবে প্রাচীন ঐতিহ্য আধুনিক বিশ্বের সাথে মিলেমিশে থাকতে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং দেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আল-জাবাল-আল-আখদারে বসন্তকালীন গোলাপের মৌসুম ওমানের অন্যতম উজ্জ্বল এবং স্মরণীয় প্রাকৃতিক ঘটনা হয়ে রয়েছে। এটি দেখায় যে, আরবের অন্যতম সুন্দর এই পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষ, প্রকৃতি এবং শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য কতটা চমৎকারভাবে মিলেমিশে থাকতে পারে।




