শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে একাডেমিক ফলাফলের ওঠানামা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, বিশেষত যখন সামগ্রিক শিক্ষাগত চাপ বিদ্যমান থাকে। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের তাৎক্ষণিক এবং আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া সন্তানের মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. আজহারুল ইসলাম পরামর্শ দিয়েছেন যে, স্কোর কমে গেলে অভিভাবকদের শান্ত থাকা উচিত এবং তাৎক্ষণিক দোষারোপ বা শাস্তির মতো নেতিবাচক পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলি উদ্বেগ ও দূরত্ব সৃষ্টি করে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহও অভিভাবকদের অযথা চাপ প্রয়োগ না করে সহনশীল আচরণের পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা শিশুদের মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদের উচিত সমস্যাটিকে দোষারোপের পরিবর্তে সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা। যেমন— "এইবার ফলাফল কেন কমল, চলো একসাথে দেখি"—এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা উচিত, যা মনোযোগকে উন্নতির দিকে চালিত করে।
একাডেমিক অবনতির মূল কারণ অনুসন্ধান করা অপরিহার্য; এটি নির্দিষ্ট জ্ঞানগত ঘাটতি, শিক্ষণ পদ্ধতির অমিল, অথবা ঘুমের অভাব বা অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম-এর মতো বৃহত্তর সমস্যা থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে দেখা গেছে, করোনা-পরবর্তী একাডেমিক চাপের কারণে ৭৫.৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, যা নির্দেশ করে যে বাহ্যিক কারণগুলিও শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
খোলামেলা যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যা হয়তো হাঁটার মতো আরামদায়ক কার্যক্রমে উৎসাহিত করা যেতে পারে, যাতে শিশুরা সমালোচনার কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ বা অন্যান্য অন্তর্নিহিত মানসিক কষ্টের কথা সহজে ভাগ করে নিতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক (অব) ড. মাহমুদুর রহমান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দনও এই ধরনের সহায়ক পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ২০২২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশের বেশি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী স্বীকার করেছে যে বিষণ্নতা, চাপ বা উদ্বেগের কারণে তাদের শিক্ষা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য সন্তানের সঙ্গে মিলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন, তা অধ্যয়নের কৌশল উন্নত করা হোক বা পর্যাপ্ত বিশ্রামের জন্য দৈনিক সময়সূচি সমন্বয় করা হোক। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় পারিবারিক ভূমিকা অপরিহার্য, কারণ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জনসংখ্যার ১৬.৮ শতাংশ (২৮ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ) হালকা থেকে গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে, এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৪ শতাংশ শিশুর মানসিক অসুস্থতা রয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই চিকিৎসা পায় না।
অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণকারীর পরিবর্তে সহায়ক অংশীদার হওয়া উচিত, যা শিশুদের একাডেমিক চ্যালেঞ্জগুলি ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করার জন্য স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই প্রেক্ষাপটে, পিতামাতার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া কেবল সন্তানের একাডেমিক সাফল্য নয়, বরং তাদের সামগ্রিক মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যতের সামাজিক প্রতিফলনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।



