২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা এক নতুন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যথাক্রমে ‘এপিক ফিউরি’ এবং ‘লায়ন্স রোর’ নামক দুটি সুসমন্বিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এই আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ও বহুমুখী পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাথমিক সংঘাতগুলোতে অন্তত ৭৮৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ছয়জন মার্কিন সেনা এবং ১১ জন ইসরায়েলি নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৬ সালের ৩ মার্চ স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত উচ্চ-রেজোলিউশন ছবির ভিত্তিতে নিশ্চিত করেছে যে, নাতাঞ্জ-এর ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কারখানার (এফইপি) প্রবেশপথের স্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইএইএ-তে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি রেজা নাজাফি গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রবিবার নাতাঞ্জে হামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন। এই ঘটনাটি পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের কৌশলগত সদর দপ্তর, কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালানো হয়। তেহরান প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাতের কঠোর ও সরাসরি জবাব দেওয়া হবে। এই পাল্টা হামলার ফলে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে এবং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ২ ও ৩ মার্চ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের নেতৃত্বাধীন সরকার ২ মার্চ এক জরুরি বৈঠকে হিজবুল্লাহর সকল প্রকার সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। লেবানন সরকার অত্যন্ত কঠোরভাবে জানিয়েছে যে, দেশের যুদ্ধ বা শান্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার কেবল রাষ্ট্রেরই রয়েছে এবং কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
হিজবুল্লাহর ক্রমাগত হামলার জবাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বৈরুত, দক্ষিণ লেবানন এবং সিরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে একটি পরিকল্পিত স্থল অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর কৌশলগত অবস্থানগুলো দখল করা এবং তাদের সামরিক অবকাঠামো যেমন ব্যারাক, সুড়ঙ্গ এবং অস্ত্রের গুদামগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া। এই স্থল অভিযানের ফলে সীমান্ত অঞ্চলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এই ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছে, যার তীব্রতা ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে, যা বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে ইউরোপে এপ্রিল মাসের টিটিএফ গ্যাসের ফিউচার মূল্য ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে মেগাওয়াট প্রতি ৬৫ ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৮৫ ডলারের উপরে উঠে গেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি এবং ১৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। বর্তমানে সংঘাতের আশঙ্কায় অন্তত ১৫০টি বিশালাকার ট্যাঙ্কার খোলা সমুদ্রে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে, যা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিয়েছে। এই লজিস্টিক বিপর্যয় কেবল জ্বালানি নয়, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বেসামরিক ও ক্রীড়া অবকাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশ কিছু হোটেল ও বিমানবন্দর এবং কুয়েত ও রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো এই সংঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেহেদী তাজের নেতৃত্বাধীন ইরান ফুটবল ফেডারেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত এবং তাদের ঘরোয়া ফুটবল লিগ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। পর্যটন সংস্থা টিইউআই (TUI) জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী লজিস্টিক বিপর্যয়ের কারণে তাদের প্রায় ১০,০০০ গ্রাহক বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েছেন এবং চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।



