সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে জার্মানির চ্যান্সেলারি অফিসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলের মধ্যে নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আলোচনাগুলি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনার উপর কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, যা পূর্ববর্তী ২৮-দফা পরিকল্পনা থেকে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। আলোচনার মূল অগ্রগতি হলো, ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি ন্যাটোর সদস্যপদ লাভের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর অনুরূপ বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা গ্যারান্টি চাইছেন। এই ছাড়টি ইউক্রেনের পক্ষ থেকে একটি বড় সমঝোতা, যা রাশিয়ার অন্যতম প্রধান যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ করে, যদিও ইউক্রেন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে বর্তমান ফ্রন্টলাইনের ভিত্তিতে কোনো প্রকার আঞ্চলিক ছাড় দেওয়া হবে না।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই নিরাপত্তা কাঠামো, যা ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইউরোপীয় নেতারা, যাদের মধ্যে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইনও ছিলেন, তারা একটি ইউরোপীয়-নেতৃত্বাধীন 'বহুজাতিক বাহিনী' গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠনে, আকাশ ও সমুদ্রসীমা সুরক্ষিত করতে এবং যুদ্ধবিরতির পরে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে কাজ করতে সহায়তা করবে। এই বহুজাতিক বাহিনীর মাধ্যমে ইউক্রেনের শান্তি সময়ে সামরিক শক্তি ৮০০,০০০ সৈন্যে বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যা রাশিয়ার দাবি করা সামরিক শক্তি হ্রাসের বিপরীত। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এই অগ্রগতিকে ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি 'প্রকৃত শান্তি প্রক্রিয়ার সুযোগ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, হিমায়িত রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরোর রুশ সম্পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য জব্দ রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা ইউক্রেনের পুনর্গঠন ও সামরিক সহায়তার জন্য ঋণ প্রদানের ভিত্তি হতে পারে। যদিও বেলজিয়াম এই সম্পদের ওপর আইনি ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী টাস্ক এই তহবিল ব্যবহারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন, তবুও এই অগ্রগতি একটি সম্মিলিত পশ্চিমা আর্থিক সহায়তার ইঙ্গিত দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি এই আলোচনার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তিনি দাবি করেছেন যে এই মুহূর্তে তারা শান্তির কাছাকাছি পৌঁছেছেন।
তবে, এই কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও কিছু কঠিন প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাশিয়ার সম্মতি এবং আঞ্চলিক বিরোধের নিষ্পত্তি, যা ইউক্রেন দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শান্তি সিদ্ধান্তের প্রতি স্বাগত জানালেও 'সময়ক্ষেপণের কৌশল' নিয়ে সতর্ক করেছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ফিওদর লুকিয়ানভ দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে মস্কো দাবি করা ভূখণ্ডে কোনো ছাড় দেবে না। উপরন্তু, ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জোর দিয়েছেন যে নিরাপত্তা গ্যারান্টিগুলি অবশ্যই আইনত বাধ্যতামূলক হতে হবে এবং মার্কিন সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
এই আলোচনাগুলি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে—১৪-১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর রাতে নভোরোসিস্কে একটি রুশ কিলো-শ্রেণীর সাবমেরিনে ইউএভি হামলা চালানো হয়েছিল। এই উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনাগুলি, যেখানে প্রায় দশটি ইউরোপীয় দেশের নেতা এবং ন্যাটো ও ইইউ-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, তা একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির দিকে ইঙ্গিত করে, যা ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায়, ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পরিবর্তে স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের মতো ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে, যা ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক পথের বাইরে ব্যক্তিগত স্তরের চুক্তি সম্পাদনের প্রবণতা তুলে ধরে।



