আমেরিকান মিডিয়া জগতের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স একটি যুগান্তকারী চুক্তির মাধ্যমে ওয়ার্নার ব্রস ডিসকভারি (WBD) অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ১১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বিশাল চুক্তির মাধ্যমে তারা স্ট্রিমিং জায়ান্ট নেটফ্লিক্সকে টপকে এই সম্পদগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার এই একীভূতকরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি আসে, যা দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলা ব্যবসায়িক দরকষাকষি এবং জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটায়। এই একীভূতকরণের ফলে সিএনএন (CNN), সিবিএস (CBS), এইচবিও (HBO) এবং নিকেলোডিয়নের মতো বিশ্বখ্যাত মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন একটি একক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে। এর পাশাপাশি হ্যারি পটার, গেম অফ থ্রোনস, ডিসি ইউনিভার্স, মিশন ইম্পসিবল এবং স্পঞ্জবব স্কয়ারপ্যান্টসের মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোও এই নতুন মিডিয়া সাম্রাজ্যের অংশ হতে যাচ্ছে।
আর্থিক দিক থেকে এই চুক্তির মোট মূল্য ১১০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ওয়ার্নার ব্রস ডিসকভারির বিশাল ঋণের বোঝা গ্রহণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির ইকুইটি বা শেয়ার মূলধনের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৮১ বিলিয়ন ডলার। প্যারামাউন্ট প্রতিটি সাধারণ শেয়ারের বিনিময়ে নগদ ৩১ ডলার প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার নেটফ্লিক্স এই অধিগ্রহণের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর ডব্লিউবিডি-র পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতিক্রমে প্যারামাউন্টের প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দর আরও বাড়ানো তাদের জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক হতো না। এই চুক্তির অংশ হিসেবে প্যারামাউন্ট ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি রেগুলেটরি ব্রেকআপ ফি বা নিয়ন্ত্রক জরিমানা প্রদানের গ্যারান্টি দিয়েছে এবং নেটফ্লিক্সের পাওনা ২.৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণও তারা পরিশোধ করবে।
নতুন এই বিশাল কর্পোরেশনের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকবেন ডেভিড এলিসন, যিনি ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই চুক্তির পেছনে প্রধান আর্থিক যোগানদাতা হিসেবে কাজ করছেন তার পিতা ল্যারি এলিসন, যিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ডেভিড এলিসন ইতিপূর্বেই তার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন যে, এই একীভূতকরণ সফল হলে তিনি সিএনএন-এর বর্তমান কার্যক্রমে আমূল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চান। এই বিশাল লেনদেন সম্পন্ন করতে এলিসন পরিবার এবং রেডবার্ড ক্যাপিটাল পার্টনার্স থেকে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের নিজস্ব মূলধন সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক অফ আমেরিকা, সিটিগ্রুপ এবং অ্যাপোলো থেকে আরও ৫৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একীভূত এই কোম্পানিটি প্রতি বছর অন্তত ৩০টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ ও মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই ছবিগুলোর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ন্যূনতম ৪৫ দিনের সিনেমা হল প্রদর্শনী নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এইচবিও ম্যাক্স এবং প্যারামাউন্ট প্লাসের মতো স্ট্রিমিং পরিষেবাগুলোর সমন্বয় ঘটানোর পাশাপাশি প্রথাগত সিনেমা হলের গুরুত্ব বজায় রাখাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের বসন্তের শুরুতে শেয়ারহোল্ডারদের ভোট গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপটি বিশ্বব্যাপী বিনোদন এবং সংবাদ পরিবেশনার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে এই বিশাল চুক্তিটি বেশ কিছু নিয়ন্ত্রক বাধার সম্মুখীন হতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপীয় কমিশন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের পক্ষ থেকে এটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, তাদের তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই চুক্তির প্রভাবগুলো খতিয়ে দেখছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত বলে গণ্য করা যায় না। একইভাবে সিনেটর অ্যাডাম শিফ হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে এই চুক্তির সর্বোচ্চ স্তরের যাচাই-বাছাইয়ের দাবি তুলেছেন। এইচএসবিসি-র বিশ্লেষক মোহাম্মদ হালুফ মন্তব্য করেছেন যে, নেটফ্লিক্স এই প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসায় তারা এখন নিজেদের ব্যবসায়িক প্রসারে মনোনিবেশ করতে পারবে, যেখানে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা দীর্ঘস্থায়ী একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকবে। অন্যদিকে, রাইটার্স গিল্ড অফ গ্রেট ব্রিটেনের সাধারণ সম্পাদক এলি পিয়ার্স এই ধরণের মেগা-একীভূতকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজার এবং কন্টেন্ট নির্মাতাদের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।



