১৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট বা বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই বৈশ্বিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ফিনল্যান্ড টানা নবমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী জাতি হিসেবে তার শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার, গ্যালাপ এবং জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণাটি মূলত ১৪৭টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ১,০০,০০০ উত্তরদাতার জীবন মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফিনল্যান্ড ১০-এর মধ্যে ৭.৭৬৪ গড় স্কোর অর্জন করেছে, যা দেশটির জাতীয় কল্যাণ ও জীবনযাত্রার মানের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
ফিনল্যান্ডের এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে উচ্চ মাথাপিছু জিডিপি, আয়ের সুষম বণ্টন, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের দীর্ঘায়ু। বরাবরের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো তালিকার শীর্ষ দশে আধিপত্য বিস্তার করেছে, যেখানে আইসল্যান্ড দ্বিতীয় এবং ডেনমার্ক তৃতীয় স্থান দখল করেছে। তবে এবারের প্রতিবেদনে সবচেয়ে চমকপ্রদ উত্থান ঘটেছে কোস্টারিকার; দেশটি চতুর্থ স্থানে উঠে এসে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সর্বকালের সেরা সাফল্য অর্জন করেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জান-ইমানুয়েল ডি নেভ এই সাফল্যের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, ওই অঞ্চলের শক্তিশালী সামাজিক পুঁজি এবং গভীর পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনই তাদের এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু উন্নত দেশে তরুণ প্রজন্মের সুখের ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (২৩তম), কানাডা (২৫তম) এবং যুক্তরাজ্যে (২৯তম) গত দশ বছরে ২৫ বছরের কম বয়সীদের জীবন সন্তুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে তরুণদের মধ্যে সুখের মাত্রা ঊর্ধ্বমুখী। গবেষকরা এই নেতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অত্যধিক ব্যবহারকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে, ১৫ বছর বয়সী কিশোরীরা যারা দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে, তাদের মধ্যে জীবন নিয়ে হতাশা বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে, যারা দিনে এক ঘণ্টার কম সময় এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাটায়, তাদের মধ্যে সুখের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।
এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়া গত বছর ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক জোনাথন হাইড এবং জ্যাক রাউশ তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, অ্যালগরিদম-ভিত্তিক ফিড এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের কন্টেন্ট তরুণদের মধ্যে অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। তবে যেসব প্ল্যাটফর্ম সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ দেয়, সেগুলোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান আবারও তালিকার সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে, যা নির্দেশ করে যে যুদ্ধ, সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষের জীবন সন্তুষ্টির প্রধান অন্তরায়। জেফ্রি ডি. স্যাক্স এবং রিচার্ড লেয়ার্ডের সম্পাদনায় প্রকাশিত ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদনে সামাজিক বিশ্বাস, উদারতা এবং দুর্নীতির প্রভাবও গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের লারি হোক্কানেন উল্লেখ করেছেন যে, এই সূচকটি মূলত মানুষের জীবনের যৌক্তিক ও দীর্ঘমেয়াদী সন্তুষ্টি পরিমাপ করে, কোনো তাৎক্ষণিক আবেগ নয়। তিনি আরও জানান যে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর এই মডেল মূলত সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং পরিমিতিবোধের সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।



