২০২৬ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞান ও আইসিটি মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে একটি ব্যাপক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে, যেখানে চীন দক্ষিণ কোরিয়াকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করেছে। বর্তমানে চীনের সামগ্রিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় ০.৭ বছর এগিয়ে রয়েছে, যা মাত্র দুই বছর আগে ছিল মাত্র ০.২ বছর। এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এশিয়ার এই দুই অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে একটি নতুন মোড় নির্দেশ করছে।
বিশেষ করে সেকেন্ডারি ব্যাটারি বা রিচার্জেবল ব্যাটারির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে সিউল দীর্ঘকাল ধরে আধিপত্য বজায় রেখেছিল। ২০২৪ সালের মধ্যে চীন এই খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে ০.২ বছর এগিয়ে গেছে। অথচ ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া এই নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে চীনের চেয়ে ০.৯ বছর এগিয়ে ছিল। এই দ্রুত পরিবর্তন নির্দেশ করে যে চীন কত দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোতে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
৫০টি জাতীয় কৌশলগত প্রযুক্তির মূল্যায়নে দেখা গেছে যে দক্ষিণ কোরিয়া এখন মাত্র ছয়টি ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব বজায় রাখতে পেরেছে। এটি ২০২২ সালের তুলনায় একটি বিশাল পতন, যখন দেশটি ১৭টি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করেছিল। ১১টি কৌশলগত ক্ষেত্রে ১৩৬টি মূল প্রযুক্তির মূল্যায়নে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং জাপানের মধ্যে সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে। বেইজিংয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল কারণ হলো উদ্ভাবনকে একটি জাতীয় অভিযান হিসেবে গ্রহণ করা এবং এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা।
২০২৪ সালে চীনের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় প্রায় ৭৮৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের প্রায় সমান। এর বিপরীতে, একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে আনুমানিক ব্যয় ছিল ১২০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। চীনের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাদের R&D ব্যয় ৩.৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রায় ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। এটি গত বছরের তুলনায় ৮.৩% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশটির মোট জিডিপির ২.৬৮% দখল করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব। শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ক্রমাগত কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদী উদ্ভাবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। ব্যাংক অফ কোরিয়া সতর্ক করে দিয়েছে যে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে বিগ ডেটা এবং ন্যানো প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতে ৬০,০০০-এর বেশি বিশেষজ্ঞের ঘাটতি দেখা দেবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৪২.৯% স্টেম (STEM) বিশেষজ্ঞ বিদেশে কাজ করার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ মেধা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী খাতে এই মেধা পাচারের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। চীনের চ্যাংক্সিন মেমোরি টেকনোলজিস (CXMT) ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৩৫% ইঞ্জিনিয়ারকে তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রলুব্ধ করে নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছে। এই ধরনের মেধা পাচার এবং অভ্যন্তরীণ জনশক্তির সংকট দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে চীন তাদের বিশাল বিনিয়োগ এবং সুসংহত জাতীয় কৌশলের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে, সেখানে দক্ষিণ কোরিয়াকে তাদের অবস্থান পুনরুদ্ধারে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।




