কিউবায় ২০১০ বন্দির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা: মানবিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক সমীকরণের নতুন অধ্যায়

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ২ এপ্রিল কিউবা প্রজাতন্ত্র একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পূর্বঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় দেশটি ২০১০ জন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে। গত এক দশকের মধ্যে কিউবা সরকারের নেওয়া এটিই সবচেয়ে বড় বন্দি মুক্তির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাভানা কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তকে একটি সার্বভৌম মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা মূলত পবিত্র সপ্তাহের ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে গ্রহণ করা হয়েছে। কিউবান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তির কোনো প্রভাব নেই।

কারাগার থেকে মুক্তির এই প্রক্রিয়াটি মূলত রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গুয়ানাবাকোয়া জেলার লা লিমা কারাগারের সামনে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যেখানে মুক্তিপ্রাপ্তদের স্বজনরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। এই ক্ষমার তালিকায় মূলত সাধারণ অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে, যার মধ্যে চুরি বা দুর্নীতির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত। তবে কিউবা সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, খুনের মতো গুরুতর অপরাধ, মাদক পাচার এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ কাজ—যেমন গবাদি পশু চুরি বা অবৈধভাবে জবাই করার দায়ে দণ্ডিতরা এই ক্ষমার সুযোগ পাবেন না।

কিউবার এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এল যখন ওয়াশিংটন থেকে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে ব্যাপক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন যে, বর্তমান আদেশের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদের রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে বিবেচনা করে, তাদের কাউকে মুক্তি দেওয়া হবে কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়। মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘ সময় ধরে শত শত কিউবান নাগরিকের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে, যাদের তারা অন্যায়ভাবে আটক বলে মনে করে। দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ক্ষেত্রে এই বন্দি মুক্তির বিষয়টি একটি প্রধান শর্ত হিসেবে রয়ে গেছে।

মজার বিষয় হলো, এই সাধারণ ক্ষমার প্রক্রিয়াটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সাথে একই সময়ে ঘটেছে। ক্ষমার ঘোষণার ঠিক আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কিউবার ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা শিথিলতা আনে। এর ফলে 'আনাতোলি কোলোডকিন' নামক একটি রুশ তেলবাহী ট্যাঙ্কার প্রায় ৭৩০,০০০ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে কিউবার জলসীমায় প্রবেশ করার অনুমতি পায়। বছরের শুরু থেকে এটিই কিউবায় আসা প্রথম বড় ধরনের জ্বালানি চালান, যা দেশটির তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে। রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভ ২ এপ্রিল নিশ্চিত করেছেন যে, মস্কো খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় আরেকটি তেলের ট্যাঙ্কার পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।

২০১১ সালের পর থেকে কিউবায় এটি পঞ্চম বড় ধরনের বন্দি মুক্তির উদ্যোগ, যা দেশটির জনাকীর্ণ কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে। ওয়াশিংটনে কিউবান দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের ক্ষমার তালিকায় নারী, তরুণ সমাজ, ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক এবং কিছু বিদেশি নাগরিকও স্থান পেয়েছেন। এর আগে মার্চ মাসে ভ্যাটিকানের প্রতি 'সদিচ্ছার নিদর্শন' হিসেবে ৫১ জন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ মাইকেল বুস্তামান্তে মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বন্দি মুক্তির এই সমন্বিত ঘটনাগুলো দুই দেশের মধ্যে ধীরগতির সংলাপের ইঙ্গিত হতে পারে। তবে কূটনৈতিক টানাপোড়েন যে এখনও শেষ হয়নি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২ এপ্রিল হাভানায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আয়োজিত বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশে।

1 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Zócalo Saltillo

  • Houston Chronicle

  • SWI swissinfo.ch

  • La Voz

  • Caracol Radio

  • La Nación

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।