২০২৫ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার: মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কের যুগান্তকারী অগ্রগতি

সম্পাদনা করেছেন: an_lymons

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সুইডিশ রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস রসায়নে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করে। এই সম্মাননা লাভ করেন ওমার ইয়াগি, সুসুমু কিতাগাওয়া এবং রিচার্ড রবসনের মতো দিকপাল বিজ্ঞানীরা। তাঁদের এই স্বীকৃতি মূলত মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (MOFs) নামক পদার্থের উদ্ভাবন ও সংশ্লেষণের জন্য, যা ওমার ইয়াগি ‘রেটিকুলার কেমিস্ট্রি’ বা ‘জালিকা রসায়ন’ নামে অভিহিত করেছেন। এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের মোট ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনর অর্থ সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে এই তিন গবেষকের মধ্যে।

বিশ্বজুড়ে এই উপাদানগুলির গুরুত্ব

এমওএফ (MOF) হলো এক ধরনের সংকর পদার্থ, যা ধাতব আয়ন বা তাদের গুচ্ছ এবং জৈব অণুগুলির সমন্বয়ে গঠিত। এগুলি পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রিমাত্রিক স্ফটিক কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোগুলির বিশেষত্ব হলো এদের অভূতপূর্ব ছিদ্রযুক্ততা বা পোরোসিটি, যেখানে বিশাল আকারের গহ্বর বিদ্যমান, যার মধ্য দিয়ে গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ সহজে চলাচল করতে পারে। এই বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলি পরিবেশগত সুরক্ষা থেকে শুরু করে শক্তি সংক্রান্ত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

রবসনের পথিকৃৎ পদক্ষেপ

১৯৮৯ সালে রিচার্ড রবসনের হাত ধরে এই গবেষণার ভিত্তি স্থাপিত হয়। হীরকের কাঠামোর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই পথে যাত্রা শুরু করেন। রবসনের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি পূর্বাভাসযোগ্য ত্রিমাত্রিক জালিকা তৈরি করা, যেখানে প্রচুর ফাঁকা স্থান থাকবে। তিনি ধনাত্মক আধানযুক্ত তামার আয়ন ব্যবহার করে প্রথম এমন কাঠামোটি নির্মাণ করেন। যদিও রবসনের প্রাথমিক নকশাগুলি স্থিতিশীলতার অভাবে ভুগছিল, তবুও এই কাজ পরবর্তী আবিষ্কারগুলির জন্য একটি অপরিহার্য সূচনা বিন্দু হিসেবে কাজ করেছিল।

ইয়াগি ও কিতাগাওয়ার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা লাভ

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে কর্মরত ওমার ইয়াগি ১৯৯৫ সালে এমন একটি ফ্রেমওয়ার্ক সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন, যা স্থিতিশীল এমওএফ তৈরির ভিত্তি স্থাপন করে। তাঁর গবেষণাগারে তৈরি উপাদানটির প্রতি গ্রামে প্রায় ৪০০০ বর্গমিটারের কাছাকাছি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠতল (সারফেস এরিয়া) ছিল। এর পরপরই, ১৯৯৭ সালে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের সুসুমু কিতাগাওয়া একটি কোবাল্ট-ভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্যাসের উপর এর নির্বাচনী শোষণ ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। তিনি দেখান যে এই কাঠামো কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেনের মতো গ্যাস শোষণ করতে পারে। কিতাগাওয়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেন, যা হলো ‘নমনীয়’ বা ‘ফ্লেক্সিবল’ ফ্রেমওয়ার্ক, যা পারিপার্শ্বিক অণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে নিজেদের কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে।

প্রয়োগের বিস্তৃতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক লক্ষেরও বেশি ধরনের এমওএফ সংশ্লেষিত হয়েছে। এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপ্লব আনতে প্রস্তুত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিল্প কারখানা থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ করা (যা ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে), শক্তি সঞ্চয় করা, নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং এমনকি বাতাস থেকে জল সংগ্রহ করা। এই বহুমুখী প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলি এটিকে একুশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

বাণিজ্যিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

কিতাগাওয়ার উদ্ভাবিত পিসিবি/এমওএফ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কিউবিট্যান® (CubiTan®) কন্টেইনার ব্যবহার করে পাইপলাইন ছাড়াই মিথেন পরিবহনের জন্য ‘স্মার্ট গ্যাস নেটওয়ার্ক’ (Smart Gas Network) এর মতো উদ্যোগে এটি কাজে লাগানো হচ্ছে। এই নোবেল পুরস্কার বস্তুমূল্যায়নের ক্ষেত্রে কয়েক দশক ধরে চলা মৌলিক গবেষণার প্রতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতিরই প্রতিফলন, যা বস্তু বিজ্ঞানের দিগন্তকে প্রসারিত করেছে।

13 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • News Center

  • LBNL

  • University of Michigan

  • Arab News

  • MOF2026 Conference

  • UC Berkeley Research

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।