লুকানো ছন্দ: কীভাবে দেশগুলোর প্রতিযোগিতা ভবিষ্যৎ জ্বালানি খাতে সহযোগিতার জন্ম দেয়

সম্পাদনা করেছেন: Nataly Lemon

লুকানো ছন্দ: কীভাবে দেশগুলোর প্রতিযোগিতা ভবিষ্যৎ জ্বালানি খাতে সহযোগিতার জন্ম দেয়-1
ভবিষ্যতের শক্তি

পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির বিশ্বে ওপরের স্তরে দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা গেলেও, এর গভীরে এক শক্তিশালী ও নিভৃত সহযোগিতার ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি সাধারণ প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে একটি গভীর ও ব্যবহারিক অংশীদারিত্বের বহিঃপ্রকাশ।

বিশেষ করে হাইড্রোজেন শক্তি এবং সমুদ্রের বিশাল জলরাশি থেকে শক্তি আহরণের নতুন পদ্ধতিগুলোর ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা অত্যন্ত স্পষ্ট। যেখানে কিছু গবেষণাগার সূর্যের আলো ব্যবহার করে পানি থেকে হাইড্রোজেন আলাদা করার জন্য উন্নত অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট তৈরিতে ব্যস্ত, সেখানে বিভিন্ন দেশ যৌথভাবে উন্মুক্ত সমুদ্রে পরীক্ষামূলক কেন্দ্র স্থাপন করছে। এই কেন্দ্রগুলোতে সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ার-ভাটার ছন্দকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আধুনিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এটি এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বরং সরঞ্জামের আকাশচুম্বী খরচ, নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব এবং সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে যন্ত্রপাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার মতো সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি পদ্ধতিগত সমাধান। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই ব্যয়বহুল প্রযুক্তিগুলোকে সাধারণের নাগালে আনা সম্ভব হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএ (IEA) নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে কীভাবে 'নোভেল হাইড্রোজেন' বা নতুন ধারার হাইড্রোজেন উৎপাদন উদ্যোগগুলো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে একত্রিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফটো-ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন প্রক্রিয়া, অণুজীব ব্যবহার করে জৈবিক পদ্ধতি এবং অত্যন্ত উন্নত মানের অনুঘটকের প্রয়োগ।

এই প্রতিটি পদ্ধতিই প্রচলিত শক্তি-নিবিড় পথগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, কোনো একটি দেশের পক্ষে এককভাবে এগুলোর বাণিজ্যিক বিস্তার বা স্কেলিং করা প্রায় অসম্ভব। তাই বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্পদের সমন্বয় এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমুদ্র শক্তি বা ওশান এনার্জির ক্ষেত্রেও একই চিত্র ফুটে ওঠে। জোয়ার-ভাটা এবং তরঙ্গ শক্তি কেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলীরা একযোগে কাজ করছেন। সমুদ্রের নোনা জল ও শক্তিশালী ঝড়ের প্রকোপে যেখানে প্রোটোটাইপগুলো কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সেখানে যৌথ পরীক্ষাগার বা পলিনগনগুলোই একমাত্র যৌক্তিক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে ঝুঁকি ভাগাভাগি হয় এবং শেখার গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনে অত্যন্ত জোরালো মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রেরণা কাজ করছে। দীর্ঘ উপকূলরেখা থাকা দেশগুলো সমুদ্রের শক্তির মাঝে প্রকৃত জ্বালানি স্বাধীনতা এবং প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ দেখতে পাচ্ছে।

অন্যদিকে, পরিবেশবান্ধব 'সবুজ' হাইড্রোজেন উৎপাদনকারীরা ভারী শিল্প থেকে শুরু করে পরিবহন খাত পর্যন্ত তাদের ব্যবসার জন্য নতুন বাজার খুঁজছে। আপাতদৃষ্টিতে সব দেশের স্বার্থ একই বিন্দুতে মিলিত হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু অদৃশ্য বাধা এখনো বিদ্যমান।

মানদণ্ডের ভিন্নতা, পেটেন্ট আইন এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি সহায়তার ধরনের বৈষম্য অনেক সময় সহযোগিতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তবে এখানে একটি মজার বিষয় লক্ষ্য করা যায়—একবার যদি দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়, তবে প্রযুক্তির প্রসারের গতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বিচ্ছিন্ন জাতীয় প্রকল্পগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।

একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, এটি মানুষকে প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার ক্ষমতা দিলেও বাস্তবে আমাদের একে অপরের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। জ্বালানি স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সরঞ্জামগুলো আসলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করে।

প্রকৃতি বা সমুদ্র কোনো জাতীয় সীমানা মানে না, তেমনি হাইড্রোজেনের অণুগুলোও কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। যেমন একজন মানুষ অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ ছাড়া জটিল কোনো যন্ত্র মেরামত করতে হিমশিম খায়, তেমনি রাষ্ট্রগুলোও এখন বুঝতে পারছে যে এককভাবে বড় কোনো বৈজ্ঞানিক সাফল্য অর্জন করা বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত কঠিন।

এই সহযোগিতামূলক পরিবেশে মিশন ইনোভেশন (Mission Innovation), বিভিন্ন শিল্প কনসোর্টিয়াম এবং আইইএ-র বিশেষ কর্মগোষ্ঠীর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা সাধারণ ডেটাবেস তৈরি করছে, যৌথ পরীক্ষা পরিচালনা করছে এবং এমন সব মানদণ্ড নির্ধারণ করছে যা ভবিষ্যতে পুরো বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বের দেশগুলো যে অঙ্গীকার করেছে, তা পূরণের জন্য এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত মূল্যবান। তবে মূল প্রশ্ন হলো, আমরা কি যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছি? মানুষের উৎসাহ হারিয়ে যাওয়ার আগেই কি আমরা পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলো থেকে বাণিজ্যিক সমুদ্র খামার বা সহজলভ্য হাইড্রোজেন উৎপাদনে সফল হতে পারব?

একটি পুরনো জাপানি প্রবাদ আছে—একটি তীর সহজেই ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু একগুচ্ছ তীর একত্রে থাকলে তা অটুট থাকে। আজকের বৈশ্বিক জ্বালানি প্রকল্পগুলোতে এই প্রাচীন প্রজ্ঞারই প্রতিফলন ঘটছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এখন কেবল একটি প্রশাসনিক শব্দ নয়, বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম।

পরিশেষে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রকৃত সাফল্য কেবল উৎপাদিত কিলোওয়াট বিদ্যুৎ বা হাইড্রোজেনের টন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত রয়েছে দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর আস্থার ওপর। আর ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, যেকোনো বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পেছনে পারস্পরিক বিশ্বাসই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।

18 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • IEA and IRENA hubs latest on hydrogen carriers

  • hydrogencouncil

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।