ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া (UPenn) এবং ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান (UMich) এর গবেষক দল সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তারা বিশ্বের ক্ষুদ্রতম সম্পূর্ণরূপে প্রোগ্রামযোগ্য এবং স্বায়ত্তশাসিত রোবট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য। এই আণুবীক্ষণিক যন্ত্রগুলির পরিমাপ মাত্র ২০০ বাই ৩০০ বাই ৫০ মাইক্রোমিটার (বা ০.২ x ০.৩ x ০.০৫ মিমি), যা একটি সাধারণ বালুকণার চেয়েও ছোট। এই ক্ষুদ্র রোবটগুলি তাদের আকারের কারণে বহু জৈবিক অণুজীবের সমতুল্য পরিসরে কাজ করতে পারে, যা চিকিৎসা এবং শিল্পক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
এই রোবটগুলির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এদের দীর্ঘস্থায়ী স্বায়ত্তশাসন; এরা কোনো বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কয়েক মাস ধরে সক্রিয় থাকতে পারে। এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা বিগত চার দশক ধরে বিজ্ঞানীদের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল, যা এই গবেষণা অতিক্রম করেছে। প্রতিটি রোবটের অভ্যন্তরে ইলেকট্রনিক সেন্সর এবং একটি অনবোর্ড কম্পিউটার সুসংহত করা হয়েছে, যা তাদের পরিবেশের তাপমাত্রা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করতে সাহায্য করে। এই সমন্বিত ব্যবস্থা প্রচলিত রোবোটিক্সের তুলনায় এক বিশাল অগ্রগতি, যেখানে প্রায়শই বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ বা চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রয়োজন হয়।
যন্ত্রগুলির চালিকা শক্তি আসে অভিনব উপায়ে: এদের গায়ে লাগানো ক্ষুদ্র সোলার সেলগুলি আলো থেকে শক্তি সংগ্রহ করে, যা একটি ইলেকট্রোকাইনেটিক প্রপালশন সিস্টেমকে সক্রিয় করে। এই সিস্টেমে কোনো যান্ত্রিক চলমান অংশ নেই; বরং এটি পরিপার্শ্বস্থ তরলের আয়নগুলিকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে, যার ফলে আয়নগুলি জলকে ঠেলে রোবটটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই যান্ত্রিক অংশবিহীন নকশা রোবটগুলিকে অত্যন্ত টেকসই করে তুলেছে এবং এরা প্রতি সেকেন্ডে এক দেহদৈর্ঘ্য পর্যন্ত গতিতে সাঁতার কাটতে পারে, এমনকি মাছের ঝাঁকের মতো দলবদ্ধভাবেও সমন্বয় সাধন করতে পারে।
UMich দলের অধ্যাপক ডেভিড ব্লাউয়ের নেতৃত্বে রোবটগুলির জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র কম্পিউটারটি তৈরি করা হয়েছিল, যা এই আকারের জন্য বিশ্বরেকর্ড ধারণ করে। এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কটি চালানোর জন্য মাত্র ৭৫ ন্যানোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যা একটি সাধারণ স্মার্টওয়াচের তুলনায় প্রায় এক লক্ষ গুণ কম শক্তি ব্যবহার করে। এই অত্যন্ত কম শক্তির চাহিদা মেটানোর জন্য, গবেষকরা বিশেষ সার্কিট তৈরি করেন যা বিদ্যুতের ব্যবহার ১০০০ গুণেরও বেশি কমিয়ে দেয়। এই সমস্ত উপাদান, যার মধ্যে প্রসেসর, মেমরি এবং সেন্সর অন্তর্ভুক্ত, একটি ন্যানোস্কেল চিপে স্থাপন করা হয়েছে। এই আবিষ্কারের নেতৃত্বদানকারী মার্ক মিসকিন, যিনি পেন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সহকারী অধ্যাপক, উল্লেখ করেছেন যে তারা স্বায়ত্তশাসিত রোবটগুলিকে পূর্বের তুলনায় দশ হাজার গুণ ছোট করতে সফল হয়েছেন, যা প্রোগ্রামযোগ্য রোবোটিক্সের জন্য এক নতুন পরিসর উন্মোচন করেছে।
তাপমাত্রা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এদের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য; এরা এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের তিন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত তাপমাত্রা পার্থক্য বুঝতে সক্ষম। এই নির্ভুলতা কোষের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং কোষীয় কার্যকলাপের পরোক্ষ সূচক হিসেবে তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রযুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাব চিকিৎসা বিজ্ঞানে দেখা যেতে পারে, যেখানে এটি পৃথক কোষের স্বাস্থ্য নিরীক্ষণে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া, শিল্প প্রক্রিয়াগুলিতে মাইক্রোস্কেল ডিভাইস নির্মাণে সহায়তা করার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রতিটি রোবট উৎপাদনে আনুমানিক এক পয়সা খরচ হয় বলে অনুমান করা হয়েছে। এই গবেষণাটি ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এবং 'সায়েন্স রোবটিক্স' ও 'প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস' (PNAS) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

