অঞ্চলের তিন কণ্ঠস্বর: দুবাই অপেরায় আরব্য সংগীতের সন্ধ্যায় নেতৃত্ব দিলেন ইয়ারা

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

Yara, Mahmoud Al Turky ও Mouhamad Khairy Dubai Opera-এ লাইভ | April 4 ConcertDubaiOpera

২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল দুবাই অপেরার মঞ্চ মধ্যপ্রাচ্যের এক অনন্য সংগীত সংলাপে মুখরিত হয়ে ওঠে। 'দুবাই, দ্য রিদম অফ লাইফ' সিরিজের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই বিশেষ কনসার্টে মূল আকর্ষণ ছিলেন লেবানিজ গায়িকা ইয়ারা। তার সাথে একই মঞ্চে সুরের মূর্ছনা ছড়িয়েছেন ইরাকি শিল্পী মাহমুদ আল তুর্কি এবং সিরীয় কণ্ঠশিল্পী মুহাম্মদ খাইরি।

Yara - আমি জানি না [আধिकारिक সঙ্গীত ভিডিও] (2015) / Yara - আমি জানি না

এই মনোজ্ঞ সন্ধ্যাটি আয়োজনের দায়িত্বে ছিল স্পটলাইটলাইভ এন্টারটেইনমেন্ট নামক একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানটি ছিল আধুনিক আরব্য সংগীত জগতের এক চমৎকার মেলবন্ধন, যেখানে অঞ্চলের বিভিন্ন সংগীত ধারা এক সুতোয় গাঁথা হয়েছিল।

লেবাননের আবেগঘন পপ সুর থেকে শুরু করে ইরাকি ছন্দের প্রাণবন্ত শক্তি এবং সিরিয়ার ধ্রুপদী কণ্ঠশৈলী—সবই যেন এক মোহনায় এসে মিশেছিল। এই কনসার্টটি প্রমাণ করেছে যে কীভাবে সমসাময়িক আরব্য মঞ্চ অঞ্চলের বিভিন্ন সংগীত ধারাকে সংযুক্ত করতে পারে।

ইয়ারার সংগীত জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে এলবিসি 'কাস এল-নোজুম' প্রতিযোগিতায় বিজয়ের মাধ্যমে। সেই প্রতিযোগিতায় তিনি 'আওদাক' গানটি পরিবেশন করে সবার নজর কেড়েছিলেন। তার শিল্পী হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে লেবানিজ সুরকার তারেক আবু জৌদেহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তারেক আবু জৌদেহ ইয়ারার প্রযোজক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তার প্রথম দিকের কালজয়ী গান 'হব কবির'-এর স্রষ্টাও ছিলেন। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার প্রথম অ্যালবাম 'তাওয়াসা ফেইয়ি' সমগ্র আরব বিশ্বে তার জনপ্রিয়তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং তাকে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে সুসংহত করে।

সময়ের সাথে সাথে ইয়ারা অঞ্চলের এমন এক বিরল শিল্পীতে পরিণত হয়েছেন যিনি আরবী ভাষার বিভিন্ন উপভাষায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে গান গাইতে পারেন। এর ফলে তার কণ্ঠ আজ পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচিত হয়।

তার দীর্ঘ কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ:

  • তিনি তিনবার সম্মানজনক মুরেক্স ডি'অর (Murex d'Or) পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
  • মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জন্য ইউনিসেফের (UNICEF) আঞ্চলিক দূত হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
  • লেবানিজ রেড ক্রসের বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।
  • তার গাওয়া 'মা বারেফ' গানটি কোনো লেবানিজ নারী শিল্পীর প্রথম গান হিসেবে ইউটিউবে ২০০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ অর্জনের রেকর্ড গড়েছে।

দুবাইয়ের এই কনসার্টে ইয়ারার অংশগ্রহণ কেবল একটি শৈল্পিক পরিবেশনা ছিল না, বরং এটি ছিল অঞ্চলের সাংস্কৃতিক উপস্থিতির এক শক্তিশালী প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। পুরো অনুষ্ঠানটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যা বিভিন্ন সংগীত শৈলীর মধ্যে একটি নিবিড় সংলাপ তৈরি করে।

ইয়ারা মঞ্চে লেবানিজ পপ ঐতিহ্যের এক আবেগঘন উপস্থাপনা করেন। তার পরিবেশনায় আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাসের সাথে সুরের এক অদ্ভুত কোমলতা মিশে ছিল, যা দর্শকদের বিমোহিত করে।

অন্যদিকে, মাহমুদ আল তুর্কি মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন আধুনিক ইরাকি সংগীতের অদম্য শক্তি ও ছন্দ। তার গানগুলো মূলত শহুরে জীবনধারা এবং বর্তমান প্রজন্মের তরুণ শ্রোতাদের পছন্দের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।

মুহাম্মদ খাইরি অনুষ্ঠানে যোগ করেছিলেন ধ্রুপদী সিরীয় ঘরানার স্বাদ। তার পরিবেশনা মূলত প্রথাগত আরব্য সংগীতের উচ্চমানের কণ্ঠশৈলী এবং দীর্ঘদিনের সংগীত সাধনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

এই তিন শিল্পীর সমন্বয়ে মঞ্চে এক বিরল শৈল্পিক আবহ তৈরি হয়েছিল। এখানে আধুনিকতা এবং ঐতিহ্য একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একই সংগীত জগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

দুবাই অপেরার ২০২৫-২০২৬ মৌসুমের অংশ হিসেবে এই অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। আয়োজক সংস্থা জানিয়েছে যে, স্পটলাইটলাইভ এন্টারটেইনমেন্টের মতো তৃতীয় পক্ষীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভেন্যু ভাড়ার ভিত্তিতে এই অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছে।

দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই ধরণের অংশীদারিত্ব একটি প্রচলিত এবং সফল রীতি হিসেবে স্বীকৃত। এই অনুষ্ঠানের জন্য দুবাই অপেরাকে বেছে নেওয়াটা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রতীকী।

বর্তমানে দুবাই অপেরা কেবল একটি সাধারণ কনসার্ট হল হিসেবে নয়, বরং অঞ্চলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রবাহের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করছে। এটি এমন এক স্থান যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বৈশ্বিক সংগীতের সাথে মেলবন্ধন ঘটায়।

এর আগে একই সিরিজের অধীনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল অর্কেস্ট্রা এখানে পারফর্ম করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এই অনুষ্ঠানটিও অঞ্চলের সংগীত মানচিত্রকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

৪ এপ্রিলের সেই সন্ধ্যাটি বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, আধুনিক আরব্য সংগীত এখন আর কেবল জাতীয় সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বিভিন্ন ঘরানার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং সহযোগিতার মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।

লেবানিজ সুরের মূর্ছনা, ইরাকি ছন্দের প্রাণচাঞ্চল্য এবং সিরীয় ধ্রুপদী কণ্ঠশৈলী—এই তিনটি উপাদান সেখানে আলাদা কোনো ধারা হিসেবে নয়, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক বার্তা হিসেবে ধ্বনিত হয়েছে।

আজকের দিনে এই ধরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোই মধ্যপ্রাচ্যের সংগীতের এক নতুন এবং আধুনিক ভাবমূর্তি তৈরি করছে। এটি এমন এক উন্মুক্ত স্থান যেখানে বিভিন্ন ঐতিহ্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা না করে বরং একে অপরকে পূর্ণতা দান করে।

এই কনসার্টটি বিশ্ববাসীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে যে, আঞ্চলিক সংগীত ঐতিহ্যগুলো তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেও একসাথে সুর মেলাতে সক্ষম। যখন বিভিন্ন কণ্ঠস্বর তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে একটি সাধারণ ছন্দে মিলিত হয়, তখন সংগীত হয়ে ওঠে সংস্কৃতির মধ্যে আস্থার ভাষা।

পরিশেষে বলা যায়, জীবনের এই ছন্দ কেবল একটি নির্দিষ্ট মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একটি বৃহত্তর জীবনবোধের অংশ যা সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয় এবং বিশ্ব সংগীতের ভাণ্ডারে এক নতুন ও অনন্য মাত্রা যোগ করে।

7 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • see.news

  • Dubai Opera

  • Platinumlist Guide

  • Shazam

  • Platinumlist.net

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।