২৭ বছর বয়সী উদীয়মান সংগীতশিল্পী নোয়াম বেটান ২০২৬ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ৭০তম ইউরোভিশন সং কনটেস্টে ইসরায়েলের প্রতিনিধি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত হয়েছেন। ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় বাছাইপর্ব 'হা কোখাভ হাবা' (দ্য নেক্সট স্টার)-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে বিজয়ী হয়ে তিনি এই গৌরবময় সুযোগ লাভ করেন। অস্ট্রিয়ার ঐতিহাসিক উইনার স্ট্যাডথালে (Wiener Stadthalle) এই প্রতিযোগিতার মূল আসর বসবে, যেখানে ১২ এবং ১৪ মে সেমিফাইনাল এবং ১৬ মে ২০২৬ তারিখে গ্র্যান্ড ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইউরোভিশন ২০২৬ শুধুমাত্র একটি বার্ষিক সংগীত উৎসব হিসেবে নয়, বরং ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন বা ইবিইউ-র জন্য একটি আস্থার পরীক্ষা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতার ভোটদান প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে ইবিইউ একগুচ্ছ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর "অসম প্রভাব বিস্তারকারী প্রচারণা" বা কারচুপির ঝুঁকি কমিয়ে আনা।
ইবিইউ ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতার জন্য যে পরিবর্তনগুলো নিশ্চিত করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে পেশাদার জুরিদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যেখানে দর্শকদের ভোটের সাথে জুরিদের ভোটের প্রভাব হবে প্রায় ৫০/৫০ শতাংশ।
- জুরি প্যানেলের সদস্য সংখ্যা ৫ থেকে বাড়িয়ে ৭ করা হয়েছে, যেখানে অন্তত দুইজন সদস্যের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হওয়া বাধ্যতামূলক।
- একজন দর্শক একটি নির্দিষ্ট পেমেন্ট মাধ্যম (অনলাইন, এসএমএস বা ফোন কল) ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ২০টির পরিবর্তে এখন মাত্র ১০টি ভোট দিতে পারবেন।
- প্রচারণা সংক্রান্ত নিয়মগুলো আরও কঠোর করা হয়েছে এবং ভোটদান প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অন্যায্য হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলকে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে, যার মধ্যে স্পেন, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং স্লোভেনিয়ার নাম বারবার আলোচনায় আসছে। তবে এই রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভিয়েনার এই আসর নিয়ে সাধারণ দর্শকদের মধ্যে উন্মাদনা আকাশচুম্বী। প্রতিযোগিতার ৯টি শোর সমস্ত টিকিট ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে, যার মধ্যে গ্র্যান্ড ফাইনালের টিকিট মাত্র ১৪ মিনিটে এবং সেমিফাইনালের টিকিটগুলো প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।
নোয়াম বেটান ইউরোভিশনের মঞ্চে কোন গানটি পরিবেশন করবেন, তা বসন্তকালের দিকে চূড়ান্ত করা হবে বলে ইবিইউ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। গান নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি ইসরায়েলি সম্প্রচার সংস্থার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে। এবারের মৌসুমে সংগীতের সুরের পাশাপাশি 'আস্থার স্থাপত্য' বা 'আর্কিটেকচার অফ ট্রাস্ট' বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জুরি এবং দর্শকদের মূল্যায়নের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা এবং প্রতিযোগিতায় একটি 'সুষ্ঠু খেলার' পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন আয়োজকদের প্রধান লক্ষ্য।
এই পুরো আয়োজনটি বিশ্বজুড়ে একটি টানটান কিন্তু ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ তৈরি করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন সংগীতের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করা হয়, তখন সিস্টেমের স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। দর্শকদের আবেগ এবং পেশাদারদের সূক্ষ্ম বিচার যখন একই বিন্দুতে মিলিত হয়, তখনই একটি প্রতিযোগিতার প্রকৃত সার্থকতা ফুটে ওঠে। এটি একটি বার্তা দেয় যে, সংগীতের শক্তি তখনই কার্যকর হয় যখন তা সততার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, এবারের ইউরোভিশন সংগীতের সুরের চেয়েও বেশি কিছু। এটি একটি বার্তা দেয় যে, আমরা সংখ্যায় অনেক হতে পারি, কিন্তু আমরা তখনই এক হতে পারব যখন নিয়মগুলো আমাদের একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতার বদলে একে অপরের কথা শোনার সুযোগ করে দেবে। এই 'সুষ্ঠু খেলার' পরিবেশই ২০২৬ সালের ভিয়েনা আসরকে স্মরণীয় করে রাখবে, যেখানে সুর আর সততা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।



