SPACE কে শুনুন! হেলিওফিজিক্স ডেটা ধ্বনি-রূপে রূপান্তরিত হচ্ছে
মস্তিষ্ক যখন সুর শোনে: কেন সংগীত প্রায় পুরো মস্তিষ্ককে একযোগে সক্রিয় করে তোলে?
লেখক: Inna Horoshkina One
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স আমাদের দেখায় যে সংগীত কেবল একটি শিল্পকলা নয়, বরং এটি নিউরোপ্লাস্টিসিটির একটি শক্তিশালী উদ্দীপক। এটি মস্তিষ্কের নতুন স্নায়বিক সংযোগ বা নিউরাল কানেকশন তৈরির ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
40Hz গামা তরঙ্গ – মনোযোগ, স্মৃতি, ঘুম ও ধ্যানের জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ফ্রিকোয়েন্সি।
ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির (McGill University) প্রখ্যাত নিউরোবায়োলজিস্ট ড্যানিয়েল জে লেভিটিন (Daniel J. Levitin) গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, সংগীত শোনার সময় আমাদের মস্তিষ্কের প্রায় প্রতিটি প্রধান অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এফএমআরআই (fMRI) স্ক্যানিং ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে সংগীতের প্রভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কীভাবে একযোগে কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় শ্রবণশক্তি থেকে শুরু করে আবেগ পর্যন্ত সবকিছু জড়িত থাকে।
- অডিটরি কর্টেক্স বা শ্রবণ বলয় ছন্দ এবং শব্দের উচ্চতা বিশ্লেষণ করে।
- মোটর কর্টেক্স শারীরিক নড়াচড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে।
- ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স মনে মনে ছবি বা দৃশ্য তৈরি করে।
- হিপোক্যাম্পাস পুরনো স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে।
- লিম্বিক সিস্টেম আমাদের মধ্যে আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
সংগীত মস্তিষ্কের এমন সব অংশকে সংযুক্ত করে যা সাধারণত আলাদাভাবে কাজ করে। এটি নিউরনের মধ্যে নতুন সিন্যাপটিক সংযোগ গঠনে উদ্দীপনা জোগায়, যার ফলে মানুষের শেখার ক্ষমতা এবং উপলব্ধির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
সংগীত এবং নিউরাল অ্যাক্টিভিটির এই গভীর সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে "রিভাইভিফিকেশন" (Revivification) নামক একটি অনন্য বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক পরীক্ষা।
এই প্রকল্পটি আমেরিকান পরীক্ষামূলক সুরকার অ্যালভিন লুসিয়ার (Alvin Lucier) কোষের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি জীবিত থাকাকালীন গবেষণার জন্য নিজের কোষ দান করতে সম্মত হয়েছিলেন।
২০২১ সালে তার মৃত্যুর পর, বিজ্ঞানীরা সেই কোষগুলো থেকে সেরিব্রাল অর্গানয়েড বা মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র কাঠামো তৈরি করেন। এই নিউরাল টিস্যুগুলোকে ৬৪টি ইলেকট্রোডের একটি সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এই ইলেকট্রোডগুলো নিউরনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরিমাপ করে এবং সেগুলোকে শব্দে রূপান্তর করে। প্রাপ্ত সিগন্যালগুলো রেজোন্যান্ট মেটাল প্লেট বা অনুরণিত ধাতব পাতগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে রিয়েল-টাইমে বা তাৎক্ষণিকভাবে সংগীত সৃষ্টি হয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অর্গানয়েডগুলো কেবল শব্দই তৈরি করে না, বরং তারা চারপাশের শব্দ পরিবেশের প্রতিও প্রতিক্রিয়া দেখায়। মাইক্রোফোনগুলো শব্দকে পুনরায় সিস্টেমে পাঠিয়ে দেয় এবং নিউরনগুলো সেই অনুযায়ী তাদের কার্যকলাপ পরিবর্তন করে।
এভাবেই একটি নিরবচ্ছিন্ন চক্র তৈরি হয়: নিউরন থেকে শব্দ তৈরি হয়, সেই শব্দের প্রতি নিউরন প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং পুনরায় নতুন সংগীতের সৃষ্টি হয়।
এই পরীক্ষাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: সৃজনশীলতার উৎস আসলে কোথায়? মানুষের মধ্যে, তার মস্তিষ্কে, নাকি নিউরাল নেটওয়ার্কের এই জটিল জালে?
মজার ব্যাপার হলো, আমাদের নিউরাল নেটওয়ার্কের গঠন মহাজাগতিক সিস্টেম বা মহাবিশ্বের স্থাপত্যের সাথে অনেকটা মিলে যায়। বিজ্ঞানীরা একে অপরের সাথে যুক্ত নিউরনের এই জটিল জালের সাথে মহাকাশের কাঠামোর তুলনা করেন।
যেভাবে নিউরনগুলো জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়, ঠিক তেমনি বিজ্ঞানীরা সোনিফিকেশন (sonification) পদ্ধতির মাধ্যমে মহাকাশের তথ্যকে শব্দে রূপান্তর করছেন।
নাসার (NASA) বিভিন্ন প্রকল্পে জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্যকে সংগীতের কাঠামোতে অনুবাদ করা হয়। এখানে মহাজাগতিক বস্তুর উজ্জ্বলতা শব্দের তীব্রতা বা ভলিউমকে প্রভাবিত করে।
মহাকাশে বস্তুর অবস্থান শব্দের পিচ বা তীক্ষ্ণতা নির্ধারণ করে এবং বিকিরণের শক্তি শব্দের ট্যাম্বার বা সুরের বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দেয়। অনেক সময় গবেষকরা চাক্ষুষ বিশ্লেষণের চেয়ে শব্দের মাধ্যমে মহাকাশের প্যাটার্নগুলো দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন।
যখন সংগীত বেজে ওঠে, তখন আমাদের নিউরনগুলো নতুন নতুন সংযোগ তৈরি করে। এই সংযোগগুলো মানুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের এবং বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
সম্ভবত এই কারণেই সংগীত মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আমাদের সঙ্গী হয়ে আছে। এটি নিউরাল নেটওয়ার্কের একজন স্থপতি হিসেবে কাজ করে, যা আমাদের আবেগ, স্মৃতি এবং কল্পনাকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।
আমরা মস্তিষ্ক এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে যত বেশি জানছি, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে সংগীত এমন একটি ভাষা যার মাধ্যমে নিউরন, মানুষ এবং স্বয়ং মহাবিশ্ব কথা বলতে পারে।
উৎসসমূহ
NASA Sonification Project
Проект Revivification (эксперимент с нейронными органоидами Alvin Lucier)



