২০২৬ সালের মে মাসে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউরোভিশন গান প্রতিযোগিতার ৭০তম আসর। এই ঐতিহাসিক মাইলফলকটি উদযাপনের জন্য শহরটি এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
এই বিশাল আয়োজনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে বিখ্যাত 'উইনার স্ট্যাডটহাল' (Wiener Stadthalle) অ্যারেনা। ১৬ হাজারেরও বেশি দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই ভেন্যুটি বিশ্বের অন্যতম সেরা সংগীত মঞ্চ হিসেবে পরিচিত। ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (EBU) এবং অস্ট্রিয়ার জাতীয় সম্প্রচারকারী সংস্থা ওআরএফ (ORF) যৌথভাবে এই প্রতিযোগিতার আয়োজক হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিযোগিতার মূল ভাবধারা বজায় রাখতে আবারও ব্যবহার করা হচ্ছে সেই সুপরিচিত স্লোগান— "ইউনাইটেড বাই মিউজিক" (United by Music)। এটি মূলত সংগীতের সর্বজনীন শক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একত্রিত করার একটি বার্তা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই বিভিন্ন দেশে জাতীয় পর্যায়ের বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রতিযোগীদের তালিকা ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় সবার আগে নিজেদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করেছে রোমানিয়া।
২০২৬ সালের ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত রোমানিয়ার জাতীয় ফাইনালে বিজয়ী মুকুট পরেছেন প্রতিভাবান গায়িকা আলেকজান্দ্রা ক্যাপাটিনেস্কু (Alexandra Căpățînescu)। তিনি তার শক্তিশালী রক কম্পোজিশন 'চোক মি' (Choke Me) দিয়ে বিচারকদের মন জয় করেন। উল্লেখ্য যে, এই সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র একটি পেশাদার জুরি প্যানেলের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
আলেকজান্দ্রা মূলত রোমানিয়ার গালাতস (Galați) শহরের বাসিন্দা। তিনি ২০২৩ সালে জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শো 'ভোচিয়া রোমানিই' (Vocea României)-তে বিজয়ী হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তার এই জয় রোমানিয়ার সংগীত অঙ্গনে নতুন এক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
এবারের প্রতিযোগিতায় আলেকজান্দ্রার অংশগ্রহণ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক মতপার্থক্য এবং অংশগ্রহণে বিরতির পর বুলগেরিয়া ও মলদোভার সাথে রোমানিয়াও আবারও ইউরোভিশনের মূল মঞ্চে ফিরে আসছে।
তবে এই আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেও ৭০তম ইউরোভিশন আসরটি গভীর বিতর্কের মুখে পড়েছে। ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (EBU) ইসরায়েলের অংশগ্রহণ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ইবিইউ-এর সাধারণ পরিষদের সভার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইউরোভিশন ২০২৬-এর প্রস্তুতি চলাকালীন স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া এবং আইসল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিযোগিতা বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছে। ১৯৭০ সালের ইউরোভিশনের পর এটিই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্মিলিত বয়কট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সম্প্রচারকারী সংস্থা আরটিই (RTÉ) তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে গাজার বর্তমান মানবিক পরিস্থিতি এবং বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, স্পেনের আরটিভিই (RTVE) জানিয়েছে যে, প্রতিযোগিতার নিয়মে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে তা মূল সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। এর পরপরই আইসল্যান্ডও এই বয়কটে সংহতি প্রকাশ করে।
উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও পর্তুগালের জাতীয় সম্প্রচারকারী সংস্থা আরটিপি (RTP) তাদের অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছে। তবে দেশটির অনেক শিল্পীই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। তারা জানিয়েছেন যে, যদি তারা জাতীয় বাছাইপর্ব 'ফেস্টিভাল দা কানসাও' (Festival da Canção)-তে বিজয়ী হন, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।
বিতর্ক নিরসনে এবং প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন নিয়মে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো মূলত দর্শকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য করা হয়েছে।
- একটি নির্দিষ্ট ডিভাইস থেকে ভোট দেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা ২০ থেকে কমিয়ে ১০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
- ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল পর্বেও পেশাদার জুরি প্যানেলের বিচারকার্য ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
- অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের প্রচারণায় বাইরের কোনো বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এই নতুন নিয়মগুলো মূলত ২০২৫ সালের ইউরোভিশনের ফলাফলের একটি সরাসরি প্রতিক্রিয়া। সেই বছর ইসরায়েল দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল এবং দর্শকদের কাছ থেকে অবিশ্বাস্য পরিমাণে ভোট পেয়েছিল, যা নিয়ে পরবর্তীতে ডিজিটাল প্রচারণা ও বাহ্যিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছিল।
ইউরোভিশন ২০২৬-এর বহুল প্রতীক্ষিত গ্র্যান্ড ফাইনাল আগামী ১৬ মে অনুষ্ঠিত হবে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই সুরের লড়াই দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
ইউরোভিশনের মঞ্চ সব সময়ই গানের চেয়েও বড় কিছু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এটি এমন এক বিশাল ক্যানভাস যেখানে সুর, ছন্দ এবং কণ্ঠের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও জাতি একে অপরের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারে।
তবে মাঝেমধ্যে এই সংগীত কেবল সম্প্রীতির কথা বলে না, বরং সমসাময়িক সময়ের কঠিন বাস্তবতা এবং উত্তেজনাকেও প্রতিফলিত করে। সংগীত এখানে হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা এবং সময়ের আয়না।
পরিশেষে, প্রতিটি নতুন প্রতিযোগিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সুর ও শব্দ সংলাপের একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম। যতক্ষণ পৃথিবীতে সংগীতের মূর্ছনা থাকবে, ততক্ষণ বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এই প্রাণের কথোপকথন চলতেই থাকবে।



