ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬: বিশ্ব সংগীতের কেন্দ্রবিন্দুতে বড় পরিবর্তন এবং নতুন প্রাণের স্পন্দন

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

BRITs 2026-এর অফিসিয়াল মনোনীতদের মধ্যে আপনাকে স্বাগতম

২১ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে যখন ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর মনোনীতদের তালিকা ঘোষণা করা হয়, তখন এটি কেবল একটি সাধারণ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে নয়, বরং বিশ্ব সংগীতের ইকোসিস্টেমে এক বিশাল পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে ধ্বনিত হয়েছিল। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ম্যানচেস্টার শহরের কো-অপ লাইভ (Co-op Live) অ্যারেনায় আয়োজিত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে লন্ডনের ওটু (O2) অ্যারেনার দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটছে, যা এতদিন ব্রিটিশ সংগীতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতো।

এই পরিবর্তন কেবল একটি ভৌগোলিক স্থানান্তরের বিষয় নয়, বরং এটি সংগীতের প্রতিধ্বনি এবং এর প্রভাবকে নতুনভাবে বিন্যাস করার একটি সাহসী পদক্ষেপ। ম্যানচেস্টারের মতো একটি সাংস্কৃতিক শহরে এই আয়োজন বিশ্ব সংগীতের মানচিত্রে এক নতুন স্পন্দন তৈরি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এটি কেবল একটি অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তন নয়, বরং ব্রিটিশ সংগীত শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণের এক শক্তিশালী ইশতেহার।

আন্তর্জাতিক সংগীতের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ব্ল্যাকপিঙ্ক (BLACKPINK) ব্যান্ডের জনপ্রিয় সদস্য রোজ (Rosé)। তিনি 'ইন্টারন্যাশনাল সং অফ দ্য ইয়ার' বিভাগে মনোনীত হয়েছেন। ব্রুনো মার্সের (Bruno Mars) সাথে তার যৌথ প্রয়াস 'এপিটি' (APT.) গানটি ইতিমধ্যে নিজস্ব এক মহিমা তৈরি করেছে। ১৮ অক্টোবর, ২০২৪-এ মুক্তি পাওয়ার পর থেকে গানটি এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস জয় করেছে এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে 'রেকর্ড অফ দ্য ইয়ার' সহ তিনটি ভিন্ন বিভাগে মনোনয়ন লাভ করেছে। ব্রিট অ্যাওয়ার্ডসে এই গানের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, কে-পপ এখন আর বিশ্ব সংগীতে কেবল বহিরাগত কোনো ধারা নয়, বরং এটি এখন বৈশ্বিক সংগীত ভাষার অন্যতম প্রধান রূপকার।

তবে সংগীতের সীমানাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে হান্টার/এক্স (HUNTR/X) নামক একটি কাল্পনিক অ্যানিমেটেড ব্যান্ড। নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র 'কে-পপ ডেমন হান্টার্স' (K-Pop Demon Hunters) থেকে উঠে আসা এই দলটির 'গোল্ডেন' (Golden) গানটি একই সাথে 'ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ' এবং 'ইন্টারন্যাশনাল সং'—এই দুই বিভাগে মনোনীত হয়েছে। গানটি বিলবোর্ড গ্লোবাল এক্সক্লুসিভ ইউ.এস. চার্টে টানা ১৯ সপ্তাহ ধরে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছিল এবং সেরা মৌলিক গান হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারও অর্জন করেছে। ব্রিট অ্যাওয়ার্ডসের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে কোনো অ্যানিমেটেড প্রজেক্ট আন্তর্জাতিক গ্রুপ বিভাগে মনোনয়ন পাওয়ার গৌরব অর্জন করল।

বর্তমান সময়ের সংগীত আর শিল্পীর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে না—তিনি কি রক্ত-মাংসের মানুষ, নাকি ভার্চুয়াল বা কোনো আঁকা চরিত্র, তা আর মুখ্য নয়। এখনকার সংগীত কেবল একটি বিষয়ই জানতে চায়, আর তা হলো গানটি বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর আবেদন তৈরি করতে পারছে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সংগীতের প্রচলিত সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে এবং এক নতুন যুগের সূচনা করছে যেখানে সৃজনশীলতাই একমাত্র পরিচয়।

ব্রিটিশ সংগীতের অভ্যন্তরীণ অঙ্গনে এবার আধিপত্য বিস্তার করছেন অলিভিয়া ডিন (Olivia Dean) এবং লোলা ইয়ং (Lola Young)। এই দুই প্রতিভাবান শিল্পী প্রত্যেকে পাঁচটি করে মনোনয়ন পেয়েছেন, যা তাদের বর্তমান জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন। তাদের ঠিক পরেই চার নম্বর অবস্থানে রয়েছেন স্যাম ফেন্ডার (Sam Fender)। তার 'পিপল ওয়াচিং' (People Watching) অ্যালবামটি ইতিমধ্যে মারকারি প্রাইজ জয় করে সংগীত সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং ব্রিটিশ সংগীতের নতুন ঢেউকে আরও বেগবান করেছে।

২০২৬ সালের এই আয়োজনের একটি বিশেষ পরিসংখ্যান সংগীত প্রেমীদের নজর কেড়েছে। এ বছর মোট মনোনয়নের প্রায় ৭০ শতাংশই পেয়েছেন নারী এবং নন-বাইনারি শিল্পীরা। এটি ব্রিট অ্যাওয়ার্ডসের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ হার। এই পরিবর্তনটি কেবল একটি সাময়িক ট্রেন্ড বা প্রবণতা নয়, বরং এটি সংগীত শিল্পের সংবেদনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতার এক আমূল পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শিল্পের একটি নতুন রূপান্তর যা বৈচিত্র্যকে উদযাপন করে।

এবারের অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকছেন জনপ্রিয় কমেডিয়ান জ্যাক হোয়াইটহল (Jack Whitehall), যিনি ষষ্ঠবারের মতো এই মঞ্চে ফিরছেন। অন্যদিকে, বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে একটি বিশেষ ট্রফি, যা ডিজাইন করেছেন ম্যানচেস্টারের কৃতি সন্তান এবং প্রখ্যাত ডিজাইনার ম্যাথিউ উইলিয়ামসন (Matthew Williamson)। তার নকশায় ম্যানচেস্টারের নিজস্ব শৈল্পিক ছোঁয়া এবং আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা গেছে, যা এই শহরের সৃজনশীল সত্তাকে তুলে ধরে।

ব্রিটিশ ফোনোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি (BPI) এবং কো-অপ লাইভ অ্যারেনার মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত দুই বছরের একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম (Andy Burnham) এই আয়োজনকে ওই অঞ্চলের জন্য একটি 'বিশাল প্রাপ্তি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর পাশাপাশি 'ম্যানচেস্টার সিন অ্যান্ড হার্ড' (Manchester Seen and Heard) স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া 'ব্রিটস ফ্রিঞ্জ' (BRITs Fringe) প্রোগ্রামটি পুরো শহরকে একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করবে, যা সাধারণ মানুষের কাছে সংগীতকে আরও পৌঁছে দেবে।

সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবার একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 'মাস্টারকার্ড সং অফ দ্য ইয়ার' এবং 'ইন্টারন্যাশনাল সং অফ দ্য ইয়ার' বিভাগের বিজয়ী নির্বাচনে ৩০ জানুয়ারি থেকে হোয়াটসঅ্যাপের (WhatsApp) মাধ্যমে পাবলিক ভোটিং বা জনমত গ্রহণ শুরু হবে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এর মাধ্যমে সংগীত নির্বাচনের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল বিশেষজ্ঞ জুরিদের হাতে না রেখে সরাসরি সাধারণ শ্রোতাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি সংগীতের গণতান্ত্রিকীকরণের পথে একটি বড় মাইলফলক।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস এমন এক সময়ের কথা বলছে যখন সংগীত আর কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র বা ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ম্যানচেস্টার, সিউল, ভার্চুয়াল জগত, নারী কণ্ঠস্বর কিংবা অ্যানিমেটেড চরিত্র—সবকিছুই যেন এক সুতোয় গেঁথে গেছে। আমাদের পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন বা রেজোন্যান্স আজ এক। আর সংগীত হলো সেই ঐক্যের সবচেয়ে নির্ভুল এবং শক্তিশালী ভাষা যা সারা বিশ্বকে এক করে রেখেছে।

7 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Telegraph

  • Suara Merdeka

  • PRS for Music

  • Official Charts

  • The Independent

  • Just Jared

  • The Guardian

  • Soompi

  • Manchester Evening News

  • Daily Mail

  • Forbes

  • Telegraph India

  • 93.3 The Drive

  • Soompi

  • ITVX

  • Wikipedia

  • Official Charts

  • Times Now

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।