মোটর নিউরন রোগে স্বরে হারিয়ে যাওয়া একজন সঙ্গীতশিল্পী আবার গান গায়
এআই-এর ছোঁয়ায় ফিরে এল সংগীতশিল্পীর কণ্ঠস্বর: প্রযুক্তির এক মানবিক বিজয়
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
৩২ বছর বয়সী আইরিশ ফোক ব্যান্ড **The Ceili House Band**-এর প্রধান গায়ক প্যাট্রিক ডার্লিং যখন **MND (BALS / ALS)** নামক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হন, তখন ধীরে ধীরে তার গান গাওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষমতা হারিয়ে যেতে থাকে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে এই প্রগতিশীল মোটর নিউরন রোগের কারণে শিল্পীর কণ্ঠস্বর অপূরণীয়ভাবে বদলে যাওয়ায় ব্যান্ডটি তাদের সমস্ত পরিবেশনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। পেশাদার সংগীত জীবনের এই আকস্মিক যতিচিহ্ন ডার্লিংয়ের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।
একটি এআই টুলের কারণে তিনি আবার লাইভ পারফর্ম করেছেন।
মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে সংগীতের পথে চলা এই শিল্পীর জন্য কণ্ঠস্বর হারানো ছিল একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং বিধ্বংসী আঘাত। প্রথাগত 'ভয়েস ব্যাংকিং' বা কৃত্রিমভাবে কণ্ঠস্বর সংরক্ষণের প্রযুক্তি তখন আর কাজে আসছিল না, কারণ প্রযুক্তিটি ব্যবহারের প্রস্তাব যখন আসে, ততক্ষণে রোগের প্রকোপে তার কণ্ঠের মূল মাধুর্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাটি একটি বড় সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে: প্রচলিত প্রযুক্তিগুলোর জন্য উচ্চমানের এবং নিখুঁত রেকর্ডিং প্রয়োজন, যা প্রগতিশীল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পক্ষে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
তবে সমাধান আসে অডিও-এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্র থেকে। গবেষক রিচার্ড কেভ, যিনি ২০২৪ সালে এমএনডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য স্পিচ রিকগনিশন প্রযুক্তির প্রয়োগের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন, তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান **ElevenLabs**-এর সাথে মিলে ডার্লিংয়ের কণ্ঠস্বর পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। এটি ছিল বিজ্ঞানের সাথে শিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন।
এই উন্নত প্রযুক্তি এমনকি খণ্ডিত এবং শব্দযুক্ত (noisy) পুরনো আর্কাইভাল রেকর্ডিং থেকেও কণ্ঠের মূল সুর উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল কণ্ঠকে কৃত্রিমভাবে 'নিখুঁত' করা নয়, বরং ডার্লিংয়ের কণ্ঠের সেই পরিচিত অসম্পূর্ণতাগুলো—যেমন তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, কণ্ঠের রুক্ষতা এবং বিশেষ ভঙ্গিগুলো—বজায় রাখা। এর ফলে সংশ্লেষিত কণ্ঠটি কোনো যান্ত্রিক অনুকরণ নয়, বরং তার ব্যক্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ফুটে ওঠে।
এই অভাবনীয় সাফল্যের পর কোম্পানিটি তাদের **Impact Program** চালু করেছে, যা এমএনডি/এএলএস এবং সমজাতীয় রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে ভয়েস ক্লোনিং লাইসেন্স প্রদান করে। এই প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য হলো যারা কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছেন, তাদের জন্য প্রযুক্তির দুয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং তাদের নিজস্ব সত্তাকে টিকিয়ে রাখা।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের মঞ্চে আবারও ফিরে আসেন প্যাট্রিক ডার্লিং। ২০২৪ সালের পর এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য পারফরম্যান্স। মঞ্চে উপস্থিত ডার্লিংয়ের সেই প্রত্যাবর্তন ছিল দর্শকদের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত, যা প্রযুক্তির জয়গান গেয়ে ওঠে।
মঞ্চে তার সাথে ছিলেন গিটারিস্ট নিক ককিং এবং বেহালাবাদক হারি মা। যখন লাইভ বাদ্যযন্ত্রের সুর বাজছিল, তখন তার পুনর্নির্মিত এআই কণ্ঠস্বরটি সেই সুরের সাথে তাল মিলিয়ে গান গেয়ে ওঠে। এটি কোনো যান্ত্রিক রেকর্ডিং ছিল না, বরং যান্ত্রিক সুরের সাথে রক্ত-মাংসের মানুষের এক অপূর্ব সহাবস্থান ছিল।
এটি কেবল কোনো প্রযুক্তির চাতুর্য ছিল না, বরং মানুষ এবং অ্যালগরিদমের এক অনন্য সমন্বয়। ডার্লিং এবং কেভ কয়েক সপ্তাহ ধরে হাতেকলমে এই মিউজিক্যাল ট্র্যাকটি তৈরি করেছেন। এআই এখানে কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু চূড়ান্ত শৈল্পিক রূপটি এসেছে মানুষের সৃজনশীলতা এবং ডার্লিংয়ের নিজস্ব শৈল্পিক নির্দেশনা থেকেই।
ডার্লিংয়ের মতে, এই ঘটনাটি মানুষের মনে এমন এক আশা এবং অর্থের সঞ্চার করেছে যা নিজে অনুভব না করলে বোঝা অসম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, এই প্রযুক্তি কেবল তার কণ্ঠ ফিরিয়ে দেয়নি, বরং তাকে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জুগিয়েছে।
এই অভাবনীয় ঘটনাটি পৃথিবীর সুরের জগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে—এটি হলো 'ফিরে পাওয়া কণ্ঠের' সুর। এটি প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি মানুষকে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, বরং মানুষের কণ্ঠকে আবারও শোনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। পরিশেষে এটি একটি চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে: একজন মানুষ হয়তো কথা বলার ক্ষমতা হারাতে পারেন, কিন্তু তার অস্তিত্বকে কখনোই স্তব্ধ করা যায় না—তা জীবনের নিরবচ্ছিন্ন ওম (OM) ধ্বনির মতো বেজে চলে।
উৎসসমূহ
WWWhat's new
WWWhat's new
The Week
Times of India
ElevenLabs
UCL News
