মহাকাশের গভীর রহস্য আর মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নিয়ে রূপালি পর্দায় হাজির হয়েছেন হলিউড সুপারস্টার রায়ান গোসলিং। অ্যান্ডি উইয়ারের বেস্টসেলার উপন্যাস 'দ্য মার্শিয়ান'-এর পর তার নতুন সৃষ্টি 'প্রজেক্ট হেইল মেরি' (Project Hail Mary) নিয়ে বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। ২০ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি ইতিমধ্যেই এই দশকের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
সিনেমার মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে রাইল্যান্ড গ্রেসকে (গোসলিং) ঘিরে, যিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি যখন একটি মহাকাশযানে জেগে ওঠেন, তখন তার স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন যে, তিনি পৃথিবী থেকে ১২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছেন এবং নিভে যেতে থাকা সূর্য থেকে মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর শেষ ভরসা কেবল তিনিই। এই গুরুদায়িত্ব পালনের পথে তাকে পাড়ি দিতে হয় অজানার এক রোমাঞ্চকর পথ।
এই মহাজাগতিক যাত্রায় গ্রেস একা নন। তার সাথে যোগ দেয় রকি নামের এক অদ্ভুত এবং বুদ্ধিমান ভিনগ্রহী প্রাণী। পাঁচ পা বিশিষ্ট মাকড়সাসদৃশ এই প্রাণীটি কথা বলে সুরের মূর্ছনায় বা মিউজিক্যাল নোটের মাধ্যমে। তাদের এই 'ইন্টারস্টেলার ব্রোম্যান্স' বা আন্তঃনাক্ষত্রিক বন্ধুত্বই সিনেমার মূল প্রাণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমালোচকরা এই জুটিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং আবেগঘন জুটি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পরিচালক ফিল লর্ড এবং ক্রিস্টোফার মিলার (যাঁরা 'দ্য লেগো মুভি'র জন্য পরিচিত) এই সিনেমার জন্য এক সাহসী এবং ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা মাত্রাতিরিক্ত সিজিআই (CGI) ব্যবহারের পরিবর্তে প্র্যাকটিক্যাল ইফেক্ট এবং পাপেট্রি বা পুতুল ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন। রকি চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে কোনো সাধারণ ডিজিটাল মডেল নয়, বরং অত্যন্ত জটিল এক মাকড়সা-সদৃশ পুতুল ব্যবহার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে অভিনেতা গোসলিং এবং 'পাথর সদৃশ' প্রাণীটির মধ্যে এক জীবন্ত রসায়ন তৈরি হয়েছে, যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
২৪৮ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেটে নির্মিত এই ছবিটি বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার দিক থেকেও অনন্য। চিত্রনাট্যকার ড্রু গডার্ড, যিনি এর আগে 'দ্য মার্শিয়ান'-এ কাজ করেছিলেন, তিনি মূল উপন্যাসের বৈজ্ঞানিক কঠোরতা বজায় রেখে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমস্যাগুলোকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সহজবোধ্যভাবে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে সিনেমাটি কেবল বিনোদন নয়, বরং বিজ্ঞানের এক রোমাঞ্চকর প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।
রায়ান গোসলিং একজন আণবিক জীববিজ্ঞানী থেকে স্কুল শিক্ষক হয়ে ওঠা রাইল্যান্ড গ্রেসের চরিত্রে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন। একাকী এক মানুষের হতাশা, একাকীত্ব এবং সূক্ষ্ম রসবোধের এক অসাধারণ ভারসাম্য তিনি বজায় রেখেছেন। প্রথম দিকের পর্যালোচকদের মতে, "গোসলিং এখানে যেন আশার আলোয় ভরা এক রকেট। সিনেমাটি ঘরানার তুলনায় কিছুটা বেশি হাস্যরসাত্মক মনে হতে পারে, তবে এই আন্তঃনাক্ষত্রিক জুটি অবিশ্বাস্যভাবে আকর্ষণীয়।"
১৫৬ মিনিটের দীর্ঘ এই চলচ্চিত্রটি দর্শকদের এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়েমি অনুভব করতে দেয় না। 'ডিউন' খ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার গ্রেগ ফ্রেজারের ক্যামেরার কাজ প্রতিটি দৃশ্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মহাকাশের বিশালতা আর নিঃসঙ্গতা তার ফ্রেমে এক মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে। কারিগরি দিক থেকে সিনেমাটি এতটাই নিখুঁত যে, এটি আগামী অস্কার আসরে আধিপত্য বিস্তার করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
মুক্তির পরপরই রটেন টম্যাটোসে (Rotten Tomatoes) ৯৫% রেটিং নিয়ে ছবিটি 'সার্টিফাইড ফ্রেশ' তকমা পেয়েছে। বক্স অফিসে রাজত্ব করার পাশাপাশি ২০২৭ সালের অস্কার আসরে কারিগরি বিভাগগুলোতে এই ছবির জয়জয়কার প্রায় নিশ্চিত। বিশেষ করে সেরা অভিনেতার ক্যাটাগরিতে রায়ান গোসলিংয়ের হাতে বহু প্রতীক্ষিত অস্কারের সোনালী মূর্তিটি ওঠার জোর সম্ভাবনা দেখছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা। 'প্রজেক্ট হেইল মেরি' কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি মানুষের টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছার এক অনন্য আখ্যান।



