২০২৬ সালের ১৫ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে আয়োজিত ৯৮তম বার্ষিক একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস বা অস্কারের আসরটি ছিল চলচ্চিত্র জগতের এক অবিস্মরণীয় রাত। এই অনুষ্ঠানে পল থমাস অ্যান্ডারসনের মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘ব্যাটল আফটার ব্যাটল’ (Battle After Battle) সন্ধ্যার প্রধান বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। থমাস পিনচনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ভাইনল্যান্ড’-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মোট ১৩টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল, যার মধ্যে ৬টি মর্যাদাপূর্ণ গোল্ডেন স্ট্যাচুয়েট বা অস্কার জয় করতে সক্ষম হয়েছে।
পরিচালক পল থমাস অ্যান্ডারসনের জন্য এই রাতটি ছিল তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এক অনন্য মাইলফলক। তিনি প্রথমবারের মতো সেরা পরিচালক এবং সেরা চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার লাভ করার পাশাপাশি সেরা অভিযোজিত চিত্রনাট্যের পুরস্কারটিও নিজের ঝুলিতে ভরেছেন। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদ, জেনোফোবিয়া বা বিদেশিভীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গভীর বিষয়বস্তুকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে।
চলচ্চিত্রে খলনায়ক কর্নেল স্টিভেন লকজাও-এর চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ শন পেন সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন। এছাড়াও ‘ব্যাটল আফটার ব্যাটল’ একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে; এটি ‘সেরা কাস্টিং’ নামক নতুন প্রবর্তিত বিভাগে প্রথম বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতায় শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে সিনেমাটি সেরা সম্পাদনার (এডিটিং) পুরস্কারটিও লাভ করেছে।
প্রতিযোগিতার দৌড়ে এই চলচ্চিত্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রায়ান কুগলারের আলোচিত সিনেমা ‘সিনার্স’ (Sinners)। এই চলচ্চিত্রটি ১৬টি মনোনয়ন পেয়ে অস্কারের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত এটি ৪টি বিভাগে জয়ী হতে পেরেছে। ‘সিনার্স’-এর অন্যতম বড় সাফল্য ছিল মাইকেল বি. জর্ডানের সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয়, যা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার হাতে উঠল। এছাড়া পরিচালক কুগলার নিজে এই সিনেমার জন্য সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের অস্কার লাভ করেন।
‘সিনার্স’ চলচ্চিত্রের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দুই যমজ ভাই ও প্রবীণ সৈনিককে কেন্দ্র করে, যারা কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য একটি মিউজিক বার খোলার স্বপ্ন দেখে। তাদের এই সংগ্রাম কেবল বর্ণবাদী সমাজের বিরুদ্ধেই ছিল না, বরং তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল এক অতিপ্রাকৃত অশুভ শক্তির। এই জটিল ও রোমাঞ্চকর আখ্যানটি দর্শকদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এই চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক অটাম ডুরাল্ড আরকাপাও অস্কারের ৯৮ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে সেরা সিনেমাটোগ্রাফির পুরস্কার জিতে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তার এই ঐতিহাসিক অর্জন চলচ্চিত্র শিল্পে নারীদের অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রখ্যাত সুরকার লুডভিগ গোরানসন এই সিনেমার অসাধারণ আবহ সঙ্গীতের জন্য অস্কারের মঞ্চে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিভাগেও এই রাতে ইতিহাস রচিত হয়েছে। রোমানীয় বংশোদ্ভূত পরিচালক নাটালি মুস্তিয়াৎসা তার অসাধারণ কাজের জন্য সেরা লাইভ অ্যাকশন শর্ট ফিল্ম বিভাগে অস্কার জয় করেন। একটি অত্যন্ত বিরল ও নাটকীয় মুহূর্তে, অনুষ্ঠানের উপস্থাপক কুমাইল নানজিয়ানি যখন ভোটের সমতা বা টাই হওয়ার কথা ঘোষণা করেন, তখন মুস্তিয়াৎসা ‘দ্য সিঙ্গার্স’ চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের সাথে এই সম্মানজনক পুরস্কারটি ভাগ করে নেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের জমকালো ডলবি থিয়েটারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি দ্বিতীয়বারের মতো সফলভাবে সঞ্চালনা করেন জনপ্রিয় কমেডিয়ান ও উপস্থাপক কোনান ও’ব্রায়েন। তার হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনা পুরো অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিল। তবে সব সিনেমার জন্য রাতটি সুখকর ছিল না; জশ সাফডির বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘মার্টি সুপ্রিম’ (Marty Supreme) ৯টি বিভাগে মনোনয়ন পেলেও একটি পুরস্কারও জিততে না পেরে রিক্ত হস্তে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করে।



