৭৬তম বার্লিনালে তুর্কি পরিচালক এমিন আলপারের ‘সালভেশন’ ছবির জুরি গ্র্যান্ড প্রিক্স জয়

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

বিখ্যাত তুর্কি চলচ্চিত্র নির্মাতা এমিন আলপার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। ৭৬তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (বার্লিনালে) তার পরিচালিত নতুন সিনেমা ‘কুর্তুলুশ’ (Kurtuluş), যার ইংরেজি নাম ‘সালভেশন’ বা ‘মুক্তি’, জুরি গ্র্যান্ড প্রিক্স পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ৬ মার্চ এটি তুরস্কের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রটি মূলত ২০০৯ সালে মার্দিনের বিলগে গ্রামে ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে, যেখানে এক নৃশংস হামলায় ৪০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।

‘কুর্তুলুশ’ সিনেমাটি মূলত একটি কাল্পনিক আখ্যান হলেও এর মূলে রয়েছে সেই বাস্তব ইতিহাস, যেখানে সমাজের উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো ফুটে উঠেছে। ছবিটিতে ধর্মের অপব্যবহার, ভয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল এবং ফিরে আসা গ্রামবাসী ও প্রভাবশালী স্থানীয় গোত্রগুলোর মধ্যে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের মতো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছে হাজেরান নামক এক শক্তিশালী ‘কোরুজু’ গোত্র এবং বেজারি সম্প্রদায়ের মধ্যকার সংঘাত। দীর্ঘ বছর পর বেজারিরা যখন তাদের ফেলে যাওয়া পৈতৃক জমি ফিরে পেতে গ্রামে ফিরে আসে, তখন থেকেই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। ভয় এবং অবিশ্বাসের এক দমবন্ধ পরিবেশে এই লড়াই শেষ পর্যন্ত এমন এক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, যেখানে ‘মুক্তির’ প্রতিশ্রুতি কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে।

পরিচালক এমিন আলপার তার রাজনৈতিক থ্রিলারধর্মী চলচ্চিত্রের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যেখানে তিনি আঞ্চলিক অস্থিরতা ও সামাজিক উদ্বেগকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন। বার্লিনালে পুরস্কার গ্রহণকালে এক আবেগঘন বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে কোনো সচেতন মানুষের পক্ষে অরাজনৈতিক থাকা সম্ভব নয়। একইসাথে তিনি বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত সমাজের প্রতি তার গভীর সংহতি প্রকাশ করেন। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন একঝাঁক প্রতিভাবান তুর্কি শিল্পী, যাদের মধ্যে রয়েছেন জানের জিন্দোরুক, বেরকায় আতেশ, ফাইয়াজ দুমান এবং নাজ গোকতান। উল্লেখ্য যে, এই চলচ্চিত্রটি তুরস্ক, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, সুইডেন এবং সৌদি আরবের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক কো-প্রডাকশন বা যৌথ প্রযোজনার ফসল।

এই বহুজাতিক সহযোগিতা চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তুর সর্বজনীনতাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সংঘাত নয়, বরং মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি, সম্পদের মালিকানা এবং সমষ্টিগত মানসিক বিভ্রমের মতো গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে স্পর্শ করেছে। ছবিটিতে কুর্দি ভাষার ব্যবহার এর শৈল্পিক সত্যতা ও বাস্তবতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দর্শকদের কাছে ছবিটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। জুরি গ্র্যান্ড প্রিক্স বা সিলভার বিয়ার অর্জন এমিন আলপারের খ্যাতিকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের মঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি যে স্থানীয় সংকটের আড়ালে বৈশ্বিক মানবিক ট্র্যাজেডি ব্যবচ্ছেদ করতে পারদর্শী, তা তার আগের কাজ ‘তেপেনিন আরদি’ (Tepenin Ardı)-তেও স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল।

একই ৭৬তম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রধান পুরস্কার ‘গোল্ডেন বিয়ার’ জয় করেছে ইলকার চাতাকের চলচ্চিত্র ‘সারি জারফলার’ (Sarı Zarflar), যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘ইয়েলো লেটারস’ নামে পরিচিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই চলচ্চিত্রটিও একটি তুর্কি কো-প্রডাকশন হিসেবে নির্মিত হয়েছে। ১২০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি বার্লিনে অভাবনীয় সাফল্যের পর এখন তার বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসবের যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। একই উৎসবে তুর্কি সংশ্লিষ্ট দুটি চলচ্চিত্রের এই বিশাল সাফল্য বিশ্ব চলচ্চিত্রে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তাদের সৃজনশীল শক্তির এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

9 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Onedio

  • Vikipedi

  • Bant Mag.

  • Independent Türkçe

  • Berlinale

  • Box Office Türkiye

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।