সুইজারল্যান্ডের তুষারশুভ্র দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের উপস্থিতি এক অভাবনীয় এবং ভিন্নধর্মী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণত এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বিশ্বনেতারা জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতিমালা নিয়ে আলোচনার জন্য খবরের শিরোনামে থাকেন। তবে এবার প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন তার রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছেন তার ব্যবহৃত একটি বিশেষ ফ্যাশন অনুষঙ্গের কারণে, যা উপস্থিত সকলের মনোযোগ মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন নিজেই এই বিশেষ চশমা পরার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন; তিনি জানিয়েছেন যে তার চোখের একটি রক্তনালী ফেটে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট দাগ আড়াল করতেই তিনি এই সানগ্লাসটি বেছে নিয়েছেন। এই শারীরিক অবস্থাকে তিনি ইতিপূর্বে অত্যন্ত সাহসের সাথে ‘সম্পূর্ণ ক্ষতিকারক নয়’ এবং ‘টাইগার আই’ বা বাঘের চোখ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
জনসাধারণের কৌতূহলের কেন্দ্রে থাকা এই সানগ্লাসটি ছিল বিখ্যাত ফরাসি চশমা প্রস্তুতকারক ব্র্যান্ড ‘হেনরি জুলিয়েন’-এর প্যাসিফিক এস ০১ (Pacific S 01) মডেলের। এই চশমাটি তাদের অত্যন্ত দামি এবং আভিজাত্যপূর্ণ গোল্ড-প্লেটেড বা স্বর্ণের প্রলেপযুক্ত বিশেষ সংগ্রহের একটি অংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে এই নির্দিষ্ট মডেলটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬৬৯ ইউরো। এই চশমাটি তৈরিতে যে বিশেষ স্বর্ণ লেপন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সমৃদ্ধ, যা মূলত উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে প্রচলিত। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া হেনরি জুলিয়েন ব্র্যান্ডটি তাদের দীর্ঘ ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। প্রেসিডেন্টের এই পছন্দ ব্র্যান্ডটির সেই প্রাচীন ঐতিহ্য এবং আধুনিক আভিজাত্যের মেলবন্ধনকে পুনরায় বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
ফরাসি এই ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডটির বর্তমান মালিকানা রয়েছে ইতালীয় শিল্প গোষ্ঠী ‘আইভিশন টেক’ (iVision Tech)-এর হাতে। এই কোম্পানিটি মিলানের ইউরোনেক্সট গ্রোথ (Euronext Growth Milan) শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন বিশ্বমঞ্চে এই চশমাটি পরার সাথে সাথেই আইভিশন টেকের পণ্যের চাহিদা এবং প্রচারণায় এক অভাবনীয় জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। আইভিশন টেকের প্রধান নির্বাহী স্টেফানো ফুলচির আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, এই ঘটনাটি তাদের কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে একটি সত্যিকারের ‘ওয়াও-ইফেক্ট’ বা বিস্ময়কর প্রভাব তৈরি করেছে। এর ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কোম্পানিটির সামগ্রিক বাজার মূলধন বা ক্যাপিটালাইজেশন প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ইউরো বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি বিরল ঘটনা।
শেয়ার বাজারে এই প্রভাবটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দ্রুতগামী। গত বুধবার মিলান স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকেই আইভিশন টেকের শেয়ারের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে এবং দিনের শেষে তা প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে এই প্রবৃদ্ধির ধারা বৃহস্পতিবার আরও নাটকীয় রূপ ধারণ করে। শেয়ারের দামের অতিরিক্ত ওঠানামা বা উচ্চ ভোলাটিলিটির কারণে বাজার কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। একজন বিশ্বনেতার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে নেওয়া একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভাগ্যে এমন আমূল পরিবর্তন আনতে পারে, তা বাজার বিশ্লেষকদের কাছে একটি গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, ম্যাক্রনের এই ‘টাইগার আই’ লুক কেবল একটি সাময়িক ফ্যাশন ট্রেন্ড হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্র্যান্ড ভ্যালুর গুরুত্বকে নতুন করে প্রমাণ করেছে। হেনরি জুলিয়েন ব্র্যান্ডের কারিগরি দক্ষতা এবং তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য এখন নতুন করে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের একটি ছোট পদক্ষেপ আইভিশন টেকের জন্য যে বিশাল ব্যবসায়িক সাফল্য বয়ে এনেছে, তা দাভোসের রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বর্তমানের বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে রাজনীতি এবং বাণিজ্য একে অপরের সাথে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।


