৩০ জানুয়ারি ২০২৬-এ ন্যায়বিচার মন্ত্রক এপস্টেইনের প্রাসাদ থেকে জব্দ করা ৩ মিলিয়নের বেশি পাতার ডকুমেন্ট, ২,০০০-র বেশি ভিডিও এবং ১৮০,০০০ ছবি উন্মোচন করেছে।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর, কুখ্যাত অর্থদাতা জেফরি এপস্টাইনের যৌন অপরাধ সংক্রান্ত গোপন নথিগুলো জনসমক্ষে আনার প্রক্রিয়াটি একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রীয় অভিযানে পরিণত হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এই সংবেদনশীল তথ্যের বিশাল প্রবাহকে ধাপে ধাপে প্রকাশের কৌশল গ্রহণ করে, যাতে সাধারণ মানুষ এই তথ্যের ভার সামলাতে পারে। তথ্যের এই ধারাবাহিক 'তরঙ্গ' পদ্ধতিটি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নাম এবং তদন্তের আগে অজানা দিকগুলো বিস্তারিতভাবে প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।
এই স্বচ্ছতা প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে 'এপস্টাইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট' স্বাক্ষরের মাধ্যমে। এই আইনের অধীনে মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) জেফরি এপস্টাইন এবং তার সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল সংক্রান্ত সমস্ত নথি ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর মধ্যে প্রকাশ করতে বাধ্য ছিল। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নথির প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল, তবে ব্যাপক কাটছাঁট এবং সম্পাদনার কারণে তা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এর ফলে, বিচার বিভাগ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তথ্য যাচাই এবং অতিরিক্ত আর্কাইভ রেকর্ড যুক্ত করার কাজ অব্যাহত রাখে।
২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় মোড় আসে, যখন বিচার বিভাগ ৩০ লক্ষ পৃষ্ঠারও বেশি নথিপত্র উপস্থাপন করে। এই প্রকাশনায় এপস্টাইনের বিভিন্ন সম্পত্তি থেকে উদ্ধার করা ২০০০টিরও বেশি ভিডিও এবং ১ লক্ষ ৮০ হাজার ছবি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার ফলে মোট প্রকাশিত উপকরণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ লক্ষ পৃষ্ঠায় পৌঁছায়। দুই দশকের তদন্তের সারসংক্ষেপ এই নথিপত্রগুলোতে ফ্লাইটের লগবুক, আর্থিক লেনদেন, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি স্থান পেয়েছে।
সর্বশেষ এই তথ্যভাণ্ডারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম শত শত বার উল্লেখ করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ২০০০ সালের আগের সংবাদ নিবন্ধ এবং ২০২৫ সালের গ্রীষ্মের অসমর্থিত এফবিআই রিপোর্টের প্রেক্ষাপটে। বিচার বিভাগ ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে দায়ের করা যৌন হয়রানির প্রায় এক ডজন বেনামী অভিযোগকে 'ভিত্তিহীন ও মিথ্যা' হিসেবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে। অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বিল ক্লিনটনের নাম অসংখ্যবার ফ্লাইটের রেকর্ডে এসেছে এবং ইলন মাস্কের ২০১২ সালের একটি ইমেল প্রকাশিত হয়েছে যেখানে তিনি এপস্টাইনের দ্বীপে 'বন্য পার্টি' সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। বিল গেটসের নামও ২০০৮ সালে এপস্টাইনের সাজা হওয়ার পরবর্তী সময়ের বৈঠকগুলোর সাথে সম্পর্কিত নথিতে পাওয়া গেছে।
নথিপত্রগুলোতে স্টিভ ব্যানন, প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং হাওয়ার্ড লুটনিকের মতো ব্যক্তিদের নামও উঠে এসেছে; লুটনিকের ক্ষেত্রে দ্বীপে ভ্রমণের পরিকল্পনা এবং চিঠিপত্রের উল্লেখ রয়েছে। এহুদ বারাককে তার ঘনঘন যোগাযোগ এবং বাসভবনে অবস্থানের কারণে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে অডিও রেকর্ডিং এবং ইমেলের প্রসঙ্গও রয়েছে। যদিও এই ফাইলগুলোতে অনেক অসমর্থিত অভিযোগ রয়েছে, তবে বেশিরভাগ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন কোনো অপরাধমূলক প্রমাণের অভাব দেখা গেছে। তবে বিচার বিভাগের একটি গুরুতর কারিগরি ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাক্রমে ভুক্তভোগীদের নাম এবং গোপনীয় ছবি প্রকাশিত হয়ে পড়ে, যা হাজার হাজার ফাইল সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে। এছাড়া, এহুদ বারাকের মাধ্যমে এপস্টাইনের সাথে মোসাদ সহ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা অসমর্থিত রয়ে গেছে।
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে মার্কিন বিচার বিভাগ ঘোষণা করে যে তারা স্বচ্ছতা আইনের বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন করেছে। তবে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যসহ সমালোচকদের দাবি, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা বা অন্য কোনো অপ্রকাশিত কারণে সম্ভাব্য ৬০ লক্ষ পৃষ্ঠার অর্ধেকই এখনও গোপন রাখা হয়েছে। এই নথিপত্র প্রকাশ বিশ্বজুড়ে এক রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যার ফলে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
অফিসিয়াল এই তথ্য প্রকাশের জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে তৈরি অপপ্রচারের জোয়ার। ইন্টারনেটে অসংখ্য ভুয়া নথি, ভিডিও এবং ছবি ছড়িয়ে পড়েছে যা এপস্টাইন আর্কাইভের আসল 'ফাঁস' হওয়া তথ্য বলে দাবি করা হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের কৃত্রিম ছবি এবং কারসাজি করা অডিও সম্বলিত এই অত্যাধুনিক জালিয়াতিগুলোর লক্ষ্য হলো জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং যাচাইকৃত তথ্যের ওপর আস্থা নষ্ট করা।