২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে মাল্টিভার্স বা বহু-মহাবিশ্বের ধারণাটি কেবল একটি কাল্পনিক তত্ত্ব থেকে সরে এসে গভীর তাত্ত্বিক গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই হাইপোথিসিসের মূল লক্ষ্য হলো আমাদের মহাবিশ্বের বিস্ময়কর ‘ফাইন-টিউনিং’ বা সূক্ষ্ম বিন্যাসের একটি অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ খুঁজে বের করা। বর্তমানে গবেষকরা মূলত দুটি প্রধান ধারার ওপর আলোকপাত করছেন: প্রথমটি হলো ১৯৫৭ সালে হিউ এভারেট ৩য় (Hugh Everett III) প্রস্তাবিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ‘মেনি-ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন’ (MWI) এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘ইনফিনিট ইনফ্লেশন’ বা অনন্ত প্রসারণ মডেল, যা অসংখ্য ‘বুদবুদ মহাবিশ্ব’ তৈরির কথা বলে।
সূক্ষ্ম বিন্যাসের যুক্তিটি নির্দেশ করে যে, পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য মহাবিশ্বের প্রায় দুই ডজন মৌলিক ধ্রুবকের অত্যন্ত নিখুঁত সমন্বয় প্রয়োজন। গবেষকদের মতে, মহাকর্ষীয় ধ্রুবক বা শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের সামান্যতম পরিবর্তনও পরমাণু, নক্ষত্র এবং শেষ পর্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব অসম্ভব করে তুলত। মাল্টিভার্স তত্ত্বটি ‘অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপল’ বা নৃতাত্ত্বিক নীতির একটি গাণিতিক ব্যাখ্যা প্রদান করে: অসংখ্য মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদেরটি কেবল সেই একটি যেখানে প্রাণের অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান। সেন্ট জোসেফ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল হ্যালপার্ন (Paul Halpern) উল্লেখ করেছেন যে, মহাকর্ষের সামান্য পরিবর্তন মহাবিশ্বকে হয় খুব দ্রুত সংকুচিত করে ফেলত অথবা এত দ্রুত প্রসারিত করত যে সূর্যের মতো নক্ষত্র তৈরি হওয়ার সুযোগই থাকত না।
এই মডেলগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রকাশনায় সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেরাইন্ট লুইস (Geraint Lewis) সংশয় প্রকাশ করে মাল্টিভার্সকে ‘একটি হাইপোথিসিস হওয়ার চেয়ে বরং ধারণার স্তূপ এবং জল্পনা-কল্পনার সমাহার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সমালোচকরা মেনি-ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশনের (MWI) বিরুদ্ধে কার্ল পপারের ‘ফলসিফায়েবিলিটি’ বা অপ্রমাণযোগ্যতার মানদণ্ড তুলে ধরেন। তবে ইগর শেন্ডেরোভিচ (Igor Shenderovich) সহ অনেক গবেষক কোয়ান্টাম কসমোলজির প্রেক্ষাপটে এর যৌক্তিক সরলতাকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, অধ্যাপক হ্যালপার্ন আরও উন্নত মডেলের অপেক্ষায় থেকে অনন্ত প্রসারণের ধারণাকে সমর্থন করে চলেছেন।
আন্দ্রে লিন্ডে (Andrei Linde) কর্তৃক বিকশিত অনন্ত প্রসারণ বা ইনফিনিট ইনফ্লেশন তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের দৃশ্যমান জগতটি মহাকাশের অগণিত ‘বুদবুদ’ বা বাবলগুলোর মধ্যে একটি মাত্র। যদিও এই মডেলটি নির্দিষ্ট মহলে বেশ জনপ্রিয়, তবে এটি অসম্ভব প্রাথমিক শর্ত এবং প্রমাণের অভাবের কারণে সমালোচনার সম্মুখীন হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহের বিষয় হলো ‘কসমিক স্কারস’ বা মহাজাগতিক ক্ষতচিহ্ন খুঁজে বের করা। ধারণা করা হয়, অতীতে আমাদের বুদবুদ মহাবিশ্বের সাথে অন্য কোনো মহাবিশ্বের সংঘর্ষ হয়ে থাকলে তার ছাপ মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণে (Relic Radiation) থেকে যেতে পারে। তবে অধ্যাপক হ্যালপার্নের মতে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো বলয় বা চিহ্ন দেখা যায়নি যাকে নিশ্চিতভাবে মহাবিশ্বের সংঘর্ষের প্রমাণ হিসেবে ধরা যায়।
মাল্টিভার্স নিয়ে এই চলমান গবেষণা কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। ২০২৬ সালের এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আমাদের মহাবিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে অজানাকে জানার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যদিও পরীক্ষামূলক প্রমাণের পথটি এখনও চ্যালেঞ্জিং, তবুও আধুনিক প্রযুক্তি এবং গাণিতিক মডেলগুলো ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে।



