শক্তি স্থানান্তরে কোয়ান্টাম স্পিন প্রভাবের ভূমিকা নিয়ে জার্মানি ও ইসরায়েলি বিজ্ঞানীদের গবেষণা

সম্পাদনা করেছেন: Irena I

জীবন্ত প্রাণীর জৈবিক প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে আলো শোষণ এবং শক্তি স্থানান্তরের মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের বিস্ময়কর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এই রহস্য উন্মোচনে জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, উলম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক একটি উচ্চাভিলাষী আন্তঃবিভাগীয় প্রকল্পে একত্রিত হয়েছেন। তাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো কোয়ান্টাম প্রভাব কীভাবে জীবন্ত কোষের মধ্যে ইলেকট্রনের গতিবিধি এবং শক্তির প্রবাহকে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা। "কোয়ান্টাম স্পিন ইফেক্টস ইন এনার্জি বায়োপ্রসেস" শীর্ষক এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্পটি ভক্সওয়াগেন ফাউন্ডেশনের "নেক্সট — কোয়ান্টাম বায়োলজি" প্রোগ্রামের অধীনে দুই মিলিয়ন ইউরোরও বেশি আর্থিক অনুদান লাভ করেছে। এই বিশাল অংকের অর্থায়ন মূলত এই উদীয়মান বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের গুরুত্ব এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক মার্টিন প্লেনিও এই গবেষণার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সালোকসংশ্লেষণের মতো মৌলিক জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো প্রকৃতিতে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়। এই গতির রহস্য কেবল ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত সূত্রগুলো দিয়ে পর্যাপ্তভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, যা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘকাল ধরে ভাবিয়ে তুলেছে। গবেষক দলটি এখন এটি নিশ্চিত করতে চাইছেন যে, এই জীবনদায়ী প্রক্রিয়াগুলোকে আরও দক্ষ, নিখুঁত এবং দ্রুততর করতে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান ঠিক কী ধরনের ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণার একটি কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য বিষয় হলো ইলেকট্রন স্পিন, যা ইলেকট্রনের একটি সহজাত কৌণিক ভরবেগ হিসেবে পরিচিত। এটি একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকীয় মোমেন্ট তৈরি করে, যা সরাসরি ইলেকট্রনের চলাচলের গতিপথ এবং গতিবেগকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।

চৌম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার তীব্রতা মূলত জৈব অণুর বিশেষ ধরনের স্থানিক বা ত্রিমাত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে, যাকে বিজ্ঞানীরা 'কাইরালিটি' বা আণবিক বিন্যাস হিসেবে অভিহিত করেন। কাইরাল অণুগুলো অনেকটা স্পিন ফিল্টারের মতো কাজ করে, যার ফলে ভিন্ন ভিন্ন স্পিন বিন্যাসের ইলেকট্রনগুলো আলাদা আলাদা সহজলভ্যতায় বা গতিতে প্রবাহিত হতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই অনন্য বৈশিষ্ট্যকে 'কাইরালিটি-ইনডিউসড স্পিন সিলেক্টিভিটি' বা সিআইএসএস (CISS) প্রভাব বলা হয়। এই বিশেষ প্রভাবটি আণবিক কাইরালিটি এবং ইলেকট্রন স্পিনের মধ্যে একটি সরাসরি এবং গভীর সংযোগ স্থাপন করে। এর ফলে জীবনের 'হোমোকাইরাল' প্রকৃতির মতো জটিল রহস্যগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, যা প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে।

সিআইএসএস প্রভাব সংক্রান্ত পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো স্পিনট্রনিক্স প্রযুক্তির উন্নতিতে এবং জীববিজ্ঞানের জটিল স্পিন-সিলেক্টিভ প্রক্রিয়াগুলো আরও গভীরভাবে বুঝতে অত্যন্ত সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে। জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইতিপূর্বে তাদের গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, ইলেকট্রন স্পিন কাইরাল পরিবেশে প্রোটন স্থানান্তরের ওপর অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলে। গবেষকদের মতে, এটি মূলত কাইরাল ফোনন বা আণবিক কম্পনের উত্তেজনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, যা প্রোটনের গতিকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করে। কোষীয় শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রোটনের এই দ্রুত চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি প্রোটন স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে নিছক একটি সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে উন্নত কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ার স্তরে উন্নীত করেছে, যা ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানের গবেষণায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে এবং নতুন প্রযুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • idw - Informationsdienst Wissenschaft e.V.

  • VolkswagenStiftung

  • Professors | Physics - Universität Ulm

  • Chiral Induced Spin Selectivity and Its Implications for Biological Functions

  • Kick-off Symposium “NEXT – Quantum Biology” - VolkswagenStiftung

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।