২০২৬ সালের ২ মার্চ বিজ্ঞান সাময়িকী 'জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স'-এ (Geophysical Research Letters) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যা বৃহস্পতির মেরুপ্রভা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে। এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো বৃহস্পতির মেরু অঞ্চলে তার গ্যালিলিয়ান উপগ্রহগুলোর প্রভাবে সৃষ্ট অবলোহিত বা ইনফ্রারেড 'পদচিহ্ন' (footprints) গুলোর বর্ণালী পরিমাপ করা হয়েছে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (JWST) অসামান্য সক্ষমতা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এই বিশাল গ্যাসীয় গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে এমন কিছু তাপীয় কাঠামো এবং ঘনত্বের পরিবর্তন খুঁজে পেয়েছেন, যা আগে কখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই আবিষ্কারটি মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
গবেষণাটিতে বৃহস্পতির শক্তিশালী চৌম্বকীয় মণ্ডলের সাথে এর অন্যতম প্রধান দুই উপগ্রহ আইও (Io) এবং ইউরোপার (Europa) মিথস্ক্রিয়া কীভাবে মেরুপ্রভা তৈরি করে, তা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো আইও-র পদচিহ্নে একটি বিশেষ 'শীতল বিন্দু' বা কোল্ড স্পটের উপস্থিতি। এই অঞ্চলে আয়নীয় পরিবেশের তাপমাত্রা ছিল মাত্র ৫৩৮ কেলভিন (২৬৫° সেলসিয়াস), যা পার্শ্ববর্তী প্রধান মেরুপ্রভা অঞ্চলের ৭৬৬ কেলভিন (৪৯৩° সেলসিয়াস) তাপমাত্রার তুলনায় অনেক কম। গবেষকরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে, এই শীতল বিন্দুতে ট্রাই-হাইড্রোজেন ক্যাটায়ন (H₃⁺) এর ঘনত্ব বৃহস্পতির সাধারণ মেরুপ্রভার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি, যা গ্রহটির বায়ুমণ্ডলীয় রসায়নের এক জটিল চিত্র তুলে ধরে।
এই গবেষণার প্রধান কৃতিত্ব নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল গবেষক ক্যাটি নোলসের (Katie Knowles), যিনি অধ্যাপক টম স্ট্যালার্ডের (Tom Stallard) সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পটি পরিচালনা করেছেন। অধ্যাপক স্ট্যালার্ড, যিনি নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে টানা ২২ ঘণ্টার একটি পর্যবেক্ষণ সময় বরাদ্দ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা (NASA), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) এবং কানাডীয় মহাকাশ সংস্থা (CSA) সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছে, যা এই গবেষণাকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে।
পৃথিবীর মেরুপ্রভা মূলত সূর্যের বায়ু বা সোলার উইন্ড দ্বারা প্রভাবিত হলেও, বৃহস্পতির ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে মেরুপ্রভা সৃষ্টিতে গ্রহটির বিশাল উপগ্রহগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আইও-র পদচিহ্নে দেখা গেছে যে, সেখানে ঘনত্বের পরিবর্তন ৪৫ গুণ পর্যন্ত হতে পারে এবং তাপমাত্রার এই নাটকীয় ওঠানামা মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ঘটে থাকে। এই ধরনের চরম পরিবর্তনশীলতা নির্দেশ করে যে, বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে উচ্চ-শক্তির ইলেকট্রনের প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই ইলেকট্রনগুলো যখন বায়ুমণ্ডলে আঘাত করে, তখন সেখানে তীব্র শক্তির বিকিরণ ঘটে, যা এই মেরুপ্রভাকে দৃশ্যমান করে তোলে।
এই গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত বর্ণালী পরিমাপগুলো সৌরজগতের বাইরের অন্যান্য গ্রহের চৌম্বকীয় মণ্ডল বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিশাল পদক্ষেপ। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, গ্রহ এবং উপগ্রহের মধ্যে এই ধরনের মিথস্ক্রিয়া মহাবিশ্বের একটি সাধারণ নিয়ম হতে পারে। এই গবেষণার ফলাফলগুলো ভবিষ্যতে সৌরজগতের অন্যান্য বস্তু, বিশেষ করে শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসের (Enceladus) ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন পথ দেখাবে। এই ধরনের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আমাদের মহাবিশ্বের জটিল প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে এবং গ্রহগুলোর বিবর্তন সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করবে।
