RCW 36 অবজেক্টটি HAWK-I ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে ESOর Very Large Telescope-এ ইমেজ করা হয়েছে; এটি নবজাত নক্ষত্রগুলোকে পাহারা দেওয়ার মতো উড়ন্ত হকের মতো দেখায়.
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি RCW 36 নামক একটি নির্গমন নেবুলা বা নিঃসরণ নীহারিকার এক অপূর্ব চিত্র ধারণ করেছেন, যা দেখতে অনেকটা মহাজাগতিক বাজপাখির মতো। এই গবেষণাটি মূলত বাদামী বামন (brown dwarfs) নামক শীতল এবং অনুজ্জ্বল উপ-নাক্ষত্রিক বস্তুগুলোর ওপর আলোকপাত করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে 'অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স' (Astronomy & Astrophysics) সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পর্তুগাল ও ফ্রান্সের পিএইচডি গবেষক আফনসো দু ব্রিট্টু দু ভালে। বাদামী বামনদের মূলত 'ব্যর্থ নক্ষত্র' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, কারণ এগুলো তাদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়ার ফিউশন বা তাপনিউক্লীয় সংযোজন প্রক্রিয়া শুরু করতে সক্ষম হয় না। এই গবেষণাটি এই ধরনের উপ-নাক্ষত্রিক বস্তু তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে।
২০২৬ সালের মার্চে ধারণ করা এই চিত্রটি একটি নাক্ষত্রিক নার্সারি বা তারার জন্মস্থানকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, যেখানে নতুন নক্ষত্র এবং উপ-নাক্ষত্রিক বস্তু উভয়ই জন্ম নিচ্ছে। ছবিতে দেখা যায়, ঘন অন্ধকার মেঘগুলো 'বাজপাখি'র মাথা ও দেহ গঠন করেছে, আর গ্যাস ও ধূলিকণার দীর্ঘ তন্তুগুলো এর ডানার আকার নিয়েছে। এই কাঠামোর নিচে একটি উজ্জ্বল নীল নীহারিকা জ্বলজ্বল করছে, যা মূলত নবজাতক বিশাল নক্ষত্রগুলোর তীব্র বিকিরণের ফলে আলোকিত হয়েছে। RCW 36 নীহারিকাটি 'গাম ২০' (Gum 20) নামেও পরিচিত, যা ভেলা (Vela) নক্ষত্রমণ্ডলে পৃথিবী থেকে প্রায় ২৩০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি ভেলা মলিকুলার রিজ (Vela Molecular Ridge) নামক একটি বিশাল নক্ষত্র গঠনকারী কমপ্লেক্সের অংশ। RCW 36-এর অভ্যন্তরে থাকা নক্ষত্রপুঞ্জের বয়স আনুমানিক ১.১ মিলিয়ন বছর বলে ধারণা করা হয়।
এই অসাধারণ ছবিটি পাওয়ার জন্য ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO)-র ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (VLT)-এ স্থাপিত HAWK-I নামক যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে। HAWK-I মূলত ইনফ্রারেড বা অবলোহিত পরিসরে (০.৯–২.৫ মাইক্রোমিটার) কাজ করে, যা ধূলিকণার আস্তরণ ভেদ করে বাদামী বামনদের মতো শীতল বস্তুগুলোকে সহজেই শনাক্ত করতে পারে। বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ বা টার্বুলেন্স কাটিয়ে ছবির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই যন্ত্রটিতে অ্যাডাপ্টিভ অপটিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ভিএলটি-র ইউটি৪ (UT4 - Yepun) ইউনিটে বসানো এই যন্ত্রটি চারটি 'Hawaii-2RG' ডিটেক্টর দ্বারা সজ্জিত এবং এটি ৭.৫ বাই ৭.৫ আর্ক-মিনিট ক্ষেত্রফল জুড়ে পর্যবেক্ষণ চালাতে সক্ষম।
এই গবেষণার প্রধান লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র উজ্জ্বল তরুণ নক্ষত্র নয়, বরং উপ-নাক্ষত্রিক বস্তুগুলোর সামগ্রিক জনসংখ্যা বিশ্লেষণ করা। গবেষক আফনসো দু ব্রিট্টু দু ভালে উল্লেখ করেছেন যে, বিশাল নক্ষত্রগুলো তাদের চারপাশের গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘকে দূরে ঠেলে দেয়। এই গবেষণায় HAWK-I/VLT-এর নতুন পর্যবেক্ষণের সাথে ২ম্যাস (2MASS), সোফি/এনটিটি (SOFI/NTT) এবং গাইয়া ডিআর৩ (Gaia DR3)-এর আর্কাইভাল তথ্য একত্রিত করে RCW 36-এর একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাটালগ তৈরি করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, RCW 36 ক্লাস্টারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে নক্ষত্রের ঘনত্ব প্রতি বর্গ পারসেকে প্রায় ৩০০০-এ পৌঁছেছে, যা সূর্যের ১ কিলোপারসেকের মধ্যে থাকা বেশিরভাগ তরুণ ক্লাস্টারের তুলনায় অনেক বেশি। এই ক্লাস্টারের সবচেয়ে বিশাল নক্ষত্রগুলো লেট-ও (late O) বা আর্লি-বি (early B) বর্ণালী টাইপের, তবে এতে শত শত কম ভরের নক্ষত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গবেষণার ফলাফল থেকে জানা গেছে যে, প্রাথমিক ভর ফাংশন (Initial Mass Function - IMF)-এর নিম্ন অংশের ঢাল বেশ সমতল, যা বেশিরভাগ গ্যালাকটিক ক্লাস্টারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে নক্ষত্র এবং বাদামী বামনের অনুপাত ২ থেকে ৫-এর মধ্যে পাওয়া গেছে। এছাড়া 'ডেনেব' (DeNeb) নামক একটি ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহারের মাধ্যমে নীহারিকার জটিল নিঃসরণ আভা অপসারণ করে ছবির নির্ভুলতা এবং তথ্যের মান উন্নত করা হয়েছে। এই গবেষণাটি আইএমএফ-এর সার্বজনীনতা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, যা নক্ষত্র গঠনের গবেষণায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।