ছবিতে, একটি তরুণ তারা গ্যাস-ধূলা ডিস্ক দ্বারা ঘেরা। একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে পৃথিবীর বাসযোগ্যতা একটি অপ্রত্যাশিত রাসায়নিক সামঞ্জস্যের ফলাফল।
পৃথিবীর রাসায়নিক ভারসাম্য: প্রাণের উৎপত্তির নেপথ্যে এক বিরল ভূ-রাসায়নিক সমীকরণ
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
ইটিএইচ জুরিখের (ETH Zurich) বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণা পৃথিবীর আদিম রাসায়নিক অবস্থার অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিছু পরামিতি উন্মোচন করেছে, যা মূলত পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের পথ প্রশস্ত করেছিল। 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' (Nature Astronomy) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটি নির্দেশ করে যে, প্রাণের স্পন্দনের জন্য কেবল জল বা অনুকূল তাপমাত্রাই যথেষ্ট ছিল না। বরং আজ থেকে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে গ্রহটির গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে এর ম্যান্টলে অক্সিজেনের সঠিক ঘনত্ব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যা জীবন গঠনের মৌলিক উপাদানগুলোকে সংরক্ষিত রাখতে সাহায্য করেছিল।
নোমিস-ইটিএইচ (NOMIS–ETH) এর গবেষক ক্রেইগ ওয়ালটন এবং ইটিএইচ জুরিখের ইনস্টিটিউট অফ জিওকেমিস্ট্রি অ্যান্ড পেট্রোলজির অধ্যাপক মারিয়া শ্যনবাখলার কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, ডিএনএ/আরএনএ এবং কোষীয় শক্তির জন্য অপরিহার্য ফসফরাস এবং প্রোটিনের জন্য প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেনের মতো জীবনদায়ী উপাদানগুলো ম্যান্টলে ধরে রাখা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে গ্রহের কেন্দ্র বা কোর গঠনের সময় অক্সিজেনের মাত্রার ওপর। ওয়ালটন এবং শ্যনবাখলার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, পৃথিবী একটি অনন্য রাসায়নিক 'গোল্ডিলকস জোনে' (Goldilocks zone) গঠিত হয়েছিল, যেখানে পরিবেশটি খুব বেশি বা খুব কম অক্সিজেন সমৃদ্ধ ছিল না।
গবেষণার সিমুলেশন অনুযায়ী, যদি অক্সিজেনের মাত্রা সামান্য বেশি হতো, তবে নাইট্রোজেন গ্যাস হিসেবে মহাকাশে বিলীন হয়ে যেত। আবার এই মাত্রা যদি অনেক কম হতো, তবে ফসফরাস গ্রহের লৌহসমৃদ্ধ কেন্দ্রে আটকে যেত, যা পরবর্তীকালে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য আর সহজলভ্য থাকত না। অধ্যাপক শ্যনবাখলার, যিনি হায়াবুসা-২ (Hayabusa2) এবং ওসিরিস-রেক্স (OSIRIS-Rex) মিশনের নমুনা বিশ্লেষণের সাথেও যুক্ত, এই ভূ-রাসায়নিক অবস্থার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। এই ফলাফলগুলো মঙ্গলের মতো গ্রহগুলোর প্রাণের বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে, কারণ ধারণা করা হয় মঙ্গল এই অত্যন্ত সংকীর্ণ রাসায়নিক সীমার বাইরে গঠিত হয়েছিল।
এই গবেষণাটি অ্যাস্ট্রোবায়োলজি বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এখন কেবল তরল জলের সন্ধানের পরিবর্তে প্রাথমিক গ্রহীয় অক্সিজিনেশনের মতো সূক্ষ্ম রাসায়নিক ফিল্টারের দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও প্রাণের উৎপত্তির আগের তত্ত্বগুলো অক্সিজেনহীন একটি বিজারক বায়ুমণ্ডলের কথা বলত, নতুন এই গবেষণাটি গ্রহের কেন্দ্র গঠনের সময় অক্সিজেনের একটি সুষম ও মধ্যবর্তী স্তরের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। গবেষক ওয়ালটন উল্লেখ করেছেন যে, প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে পৃথিবীর এই সক্ষমতা আসলে একটি বিরল 'রাসায়নিক সৌভাগ্যের' ফল, যা মহাবিশ্বের অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হতে পারে।
গবেষণার এই ফলাফলগুলো আরও ইঙ্গিত দেয় যে, ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানের ক্ষেত্রে কেবল জলের উপস্থিতি নয়, বরং তাদের মাতৃনক্ষত্রের রাসায়নিক গঠনও গভীরভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ নক্ষত্রের গঠন উপাদানগুলো তাদের চারপাশে গঠিত হতে থাকা গ্রহগুলোর রসায়নকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। এটি ইটিএইচ জুরিখের নেতৃত্বাধীন এনসিসিআর 'জেনেসিস' (NCCR Genesis)-এর মতো প্রকল্পগুলোর জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই প্রকল্পটি প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পৃথিবী বিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানকে একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করছে, যা ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রাণের বিকাশের জন্য কেবল উপাদানের উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলোকে গ্রহের ম্যান্টলে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ধরে রাখাও একটি বিরল ভূ-রাসায়নিক সংযোগ। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে কেন মহাবিশ্বের অগণিত গ্রহের মধ্যে পৃথিবী অনন্য এবং কেন এখানে প্রাণের স্পন্দন সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, গ্রহের প্রাথমিক বিবর্তনের সময় রাসায়নিক উপাদানগুলোর এই সঠিক বিন্যাস না ঘটলে আজ আমরা যে জটিল জীববৈচিত্র্য দেখছি তা হয়তো কখনোই সম্ভব হতো না। এই নতুন তথ্য ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণায় কোন গ্রহগুলোকে প্রাণের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের প্রধান সহায়ক হবে।
উৎসসমূহ
Knowridge Science Report
STEMPASSION
Maria Schönbächler - Wikipedia
Craig Walton - The NOMIS Foundation
Prof. Maria Schönbächler - Fantasy Basel
Why only a small number of planets are suitable for life - MyScience.ch