হাজারো ছোট ভ্রূণ ঘুরছে — এবং সমুদ্র তাদেরকে একটি নিখুঁত জ্যামিতিতে একত্রিত করে.
যখন জীবন স্ফটিকের রূপ নেয়: সামুদ্রিক তারামাছের ভ্রূণ পদার্থের নতুন অবস্থার উন্মোচন
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
বিজ্ঞানীরা Patiria miniata নামক সামুদ্রিক তারামাছের ভ্রূণের ঘন কালচারের মধ্যে সক্রিয় পদার্থের এক অসাধারণ এবং বিরল ঘটনা লক্ষ্য করেছেন। Yu-Chen Chao-এর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষক দলের এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, বায়ু ও জলের সংযোগস্থলে যখন এই ভ্রূণগুলোর ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক বিশেষ ধরনের কাঠামো তৈরি করতে শুরু করে। গবেষকরা এই অনন্য কাঠামোর নাম দিয়েছেন ‘জীবন্ত কাইরাল স্ফটিক’ (living chiral crystals)।
এই কাঠামোগুলো একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ষড়ভুজাকার ল্যাটিস বা হেক্সাগোনাল গ্রিড তৈরি করে, যা সাধারণত বিভিন্ন খনিজ পদার্থের স্ফটিকের মধ্যে দেখা যায়। তবে এই পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এখানে স্ফটিকের প্রতিটি একক বা উপাদান কোনো জড় কণা নয়, বরং একটি জীবন্ত প্রাণী। এই আবিষ্কারটি জীববিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যবর্তী চিরাচরিত সীমানাকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।
এই ‘জীবন্ত স্ফটিক’ তৈরির মূল রহস্য নিহিত রয়েছে ভ্রূণগুলোর নিজস্ব চলন বা গতির মধ্যে। প্রতিটি ভ্রূণ তরল মাধ্যমের ভেতরে অনবরত ঘুরতে থাকে এবং এর ফলে তাদের চারপাশে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে হাইড্রোডাইনামিক প্রবাহ বা জলের সূক্ষ্ম স্রোত তৈরি হয়। এটিই মূলত এই জটিল প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করে।
যখন এই ধরনের অসংখ্য জীবন্ত ভ্রূণ একটি নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হয়, তখন তাদের তৈরি করা এই ক্ষুদ্র স্রোতগুলো একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে শুরু করে। এর ফলে একটি সম্মিলিত আকর্ষণের সৃষ্টি হয় যা ধীরে ধীরে ভ্রূণগুলোকে একটি সুসংগঠিত ল্যাটিসে সাজিয়ে তোলে এবং পদার্থের একটি নতুন ‘নন-ইকুইলিব্রিয়াম’ বা ভারসাম্যহীন দশা তৈরি করে।
এই পুরো ব্যবস্থাটি যেমন জীবন্ত, তেমনি অত্যন্ত গতিশীল। এই স্ফটিকগুলো স্থির থাকে না, বরং তারা বিভিন্ন ধরনের কম্পনশীল বা দোদুল্যমান অবস্থার মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই আচরণটি ‘কাইরাল সিমেট্রি’ বা প্রতিসাম্য লঙ্ঘনের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে প্রতিটি উপাদানের ঘূর্ণন পুরো ব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে।
এই গবেষণাটি বিজ্ঞানের ‘সক্রিয় পদার্থ’ (active matter) নামক শাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে কণাগুলো নিজেরাই শক্তি গ্রহণ করে এবং নিজস্ব গতি তৈরি করে। প্রথাগত তাপগতিবিদ্যার নিয়মে যেখানে শৃঙ্খলা আসে স্থিরতা থেকে, সেখানে এই জীবন্ত স্ফটিকের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন সক্রিয়তা এবং গতির মাধ্যমে।
‘জীবন্ত কাইরাল স্ফটিকের’ এই পর্যবেক্ষণ জৈবিক সিস্টেমে ভারসাম্যহীন দশার অস্তিত্বের সরাসরি পরীক্ষামূলক প্রমাণ প্রদান করে। এটি মূলত একটি বাস্তব উদাহরণ যে কীভাবে জীবন নিজেই পদার্থের জটিল স্থাপত্য বা আর্কিটেকচার তৈরি করতে সক্ষম এবং কীভাবে ক্ষুদ্রতম এককগুলো সম্মিলিতভাবে বড় কোনো কাঠামো গঠন করে।
এই প্রক্রিয়ার গভীর জ্ঞান ভবিষ্যতে প্রযুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রাকৃতিক কৌশল ব্যবহার করে স্ব-একত্রিত রোবোটিক সিস্টেম (self-assembling robotic systems) তৈরি করা সম্ভব হবে, যেখানে অনেকগুলো ছোট রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো গঠন করবে।
এছাড়াও, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে তাপের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতিটি কার্যকর হতে পারে। ভ্রূণগুলো যেভাবে তাদের চারপাশের তরল নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক সেই একই নীতি ব্যবহার করে ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। এটি তাপগতিবিদ্যার নতুন প্রয়োগের পথ খুলে দিতে পারে।
একই সাথে, সক্রিয় পদার্থের মাধ্যমে নতুন ধরনের স্মার্ট মেটেরিয়াল বা উপাদান তৈরি করা সম্ভব হবে। এমন সব সিস্টেম উদ্ভাবন করা যাবে যা পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্রুত নিজের গঠন বা বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে, যা আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এই ধরনের জটিল ঘটনাগুলো বিস্তারিতভাবে অধ্যয়নের জন্য বিজ্ঞানীরা Patiria miniata চাষের বা কালচারের পদ্ধতিতে বেশ কিছু উন্নত পরিবর্তন এনেছেন। একটি স্থিতিশীল গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে এই উন্নত চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই লার্ভাগুলো প্রায় ১৫ দিনের মধ্যে গবেষণার উপযোগী বা প্রস্তুত পর্যায়ে পৌঁছায়। অন্যদিকে, কৃত্রিম প্রবাহমান ব্যবস্থায় এদের পূর্ণ যৌন পরিপক্কতা আসতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি শক্তিশালী জৈবিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
এই পুরো ঘটনাটি আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, প্রকৃতির শৃঙ্খলা বা অর্ডার সবসময় বাহ্যিক কোনো শক্তি থেকে আসে না। বরং জীবনের নিজস্ব স্পন্দন এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া থেকেই এই ধরনের সুশৃঙ্খল কাঠামো তৈরি হতে পারে। এটি মহাবিশ্বের এক অনন্য সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ।
পরিশেষে বলা যায়, অনেক সময় কেবল জীবন্ত উপাদানগুলোকে একত্রে রাখাই যথেষ্ট। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই তখন সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গতির সমন্বয় ঘটে এবং জীবন নিজেই এক অপূর্ব সুন্দর স্ফটিক নির্মাণ করতে শুরু করে। বিজ্ঞানের এই নতুন দিগন্ত আমাদের জীবনের গূঢ় রহস্যগুলো বুঝতে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।
উৎসসমূহ
Nature
Google Scholar
MIT Physics
ResearchGate
PubMed
ScienceDaily



